২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গবেষণা ও শিল্পের দিকনির্দেশনা হাইপ থেকে ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। বড় ভাষা মডেল তৈরি করার পরিবর্তে ছোট মডেলকে নির্দিষ্ট কাজের জন্য স্থাপন, ডিভাইসে বুদ্ধিমত্তা সংযোজন এবং মানব কর্মপ্রবাহে মসৃণ একীভূতকরণ এখন প্রধান লক্ষ্য। এই পরিবর্তনটি ২০২৫ সালে AI‑এর হাইপ‑চেকের পরবর্তী স্বাভাবিক উন্নয়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে AI‑এর উন্নয়ন কেবলমাত্র বৃহৎ স্কেলিং নয়, বরং নতুন আর্কিটেকচার গবেষণা, লক্ষ্যভিত্তিক ডেপ্লয়মেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় এজেন্টের পরিবর্তে কাজকে সহায়তা করা এজেন্টের দিকে অগ্রসর হবে। শিল্পে এখনো উদ্দীপনা আছে, তবে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের তুলনায় বাস্তবিক ফলাফলের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
AI‑এর আধুনিক যুগের সূচনা ২০১২ সালে অ্যালেক্স নেট (AlexNet) পেপার দিয়ে হয়। আলেক্স ক্রিজহেভস্কি, ইল্যা সুটস্কেভার এবং জিওফ্রি হিন্টন এই গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে GPU ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ ছবির উদাহরণ থেকে বস্তু শনাক্ত করা যায়। যদিও গণনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ছিল, GPU‑এর সমর্থনে এই পদ্ধতি সম্ভব হয় এবং পরবর্তী দশকে বিভিন্ন কাজের জন্য নতুন মডেল আর্কিটেকচার বিকাশে গবেষকদের উৎসাহ জাগায়।
প্রায় এক দশক পর, ২০২০ সালে ওপেনএআই GPT‑3 প্রকাশ করে AI‑এর স্কেলিং যুগের শীর্ষে পৌঁছায়। মডেলকে ১০০ গুণ বড় করে তোলার ফলে কোডিং, যুক্তি এবং ভাষা বোঝার মতো জটিল ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয়, স্পষ্টভাবে কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই। এই সাফল্যকে “স্কেলিংয়ের যুগ” বলা হয়, যেখানে বেশি কম্পিউট, বেশি ডেটা এবং বড় ট্রান্সফরমার মডেলকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়।
কিয়ান কাটানফোরুশ, Workera নামক AI এজেন্ট প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, এই সময়কে স্কেলিংয়ের শীর্ষবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে একই সময়ে বহু গবেষক স্কেলিংয়ের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তারা উল্লেখ করেন যে কম্পিউট ক্ষমতা ও ডেটার বৃদ্ধি আর পূর্বের মতো অগ্রগতি আনতে পারছে না।
মেটা (পূর্বে ফেসবুক) এর প্রাক্তন প্রধান AI বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুন দীর্ঘদিন থেকে স্কেলিংয়ের অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে আসছেন। তিনি নতুন আর্কিটেকচার ও দক্ষ মডেল ডিজাইনের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন, যাতে AI সিস্টেমের পারফরম্যান্স ডেটা ও কম্পিউটের পরিমাণের ওপর নির্ভর না করে।
ইল্যা সুটস্কেভারও সাম্প্রতিক আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান মডেলগুলো পারফরম্যান্সে সমতলতা দেখাচ্ছে, অর্থাৎ প্রশিক্ষণের ফলাফল আর উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হচ্ছে না। এই পর্যবেক্ষণ স্কেলিংয়ের সীমা নির্দেশ করে এবং গবেষকদের নতুন পদ্ধতির দিকে ধাবিত করে।
এইসব বিশ্লেষণের পর, ২০২৬ সালে AI শিল্পের ফোকাস ছোট, দক্ষ মডেলকে নির্দিষ্ট প্রয়োগে স্থাপন করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, এজ ডিভাইসে বুদ্ধিমত্তা সংযোজনের মাধ্যমে রিয়েল‑টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে, যা উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা এবং গ্রাহক সেবার মতো ক্ষেত্রকে রূপান্তরিত করতে পারে।
এছাড়া, মানব কর্মপ্রবাহে AI‑এর মসৃণ সংযোজনের জন্য সিস্টেম ডিজাইন করা হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা জটিল টুলের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় সহায়তা পায়। এই পদ্ধতি AI‑কে স্বতন্ত্র এজেন্টের বদলে কাজের সহায়ক হিসেবে অবস্থান দেবে।
শিল্পে এখনো ডেমো এবং পাইলট প্রকল্প চালু রয়েছে, তবে সেগুলোকে দ্রুত বাস্তবিক পণ্য ও সেবায় রূপান্তরিত করার চাপ বাড়ছে। কোম্পানিগুলো বড় মডেল প্রশিক্ষণের বদলে বিদ্যমান মডেলকে অপ্টিমাইজ করে নির্দিষ্ট কাজের জন্য টিউন করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনকে “প্র্যাগমাটিক AI” বলা যেতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি শুধুমাত্র শোরগোল নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, স্মার্ট ফ্যাক্টরিতে রিয়েল‑টাইম ত্রুটি সনাক্তকরণ, চিকিৎসা ডায়াগনসিসে সহায়তা এবং গ্রাহক সেবায় স্বয়ংক্রিয় চ্যাটবটের ব্যবহার বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৬ সালে AI গবেষণা স্কেলিংয়ের সীমা অতিক্রম করে নতুন আর্কিটেকচার ও ব্যবহারিক ডেপ্লয়মেন্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শিল্পের উচ্ছ্বাস এখনও বজায় থাকলেও, এখনো বেশি বাস্তবিক ফলাফল ও মানব কর্মের সাথে সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে AI‑কে আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানবিক কাজের সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলবে, যা বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদনশীলতা ও সেবার মান উন্নত করবে।



