ইরানের রাজধানী তেহরানে ১ ডলারকে ১৪,৪০০,০০০ রিয়াল পর্যন্ত অবমূল্যায়ন হওয়ার পর দেশব্যাপী অর্থনৈতিক অশান্তি তীব্রতর হয়েছে। রিয়ালের মানের রেকর্ড পতনের পর ৩১ ডিসেম্বর থেকে মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলোতে বিশাল হ্রাস দেখা যায়, যা বিক্ষোভের শিখা জ্বালিয়ে দেয়। বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনে চলমান আর্থিক সংকট ও মুদ্রার অবিরাম পতন উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের তীব্রতা ২০২২ সালের পরে সবচেয়ে বড় গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটছে। তেহরানের বিভিন্ন বিনিময় কেন্দ্রের রিয়াল মানের হ্রাসের পরই প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমে আসে, আর সরকারী নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় চেনারাহ শহরে একটি মিলিশিয়া ঘাঁটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটার খবর পাওয়া যায়। একই সময়ে আনজা ও নাহাভান্দ শহরে ইরানের ইরাক্রিয়েশন গার্ড (আইআরজিসি) এর বিভিন্ন স্থাপনার ওপর হামলার রিপোর্ট আসে। এই আক্রমণগুলোতে নিরাপত্তা কর্মী ও প্রতিবাদকারীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
বিপুল অশান্তির মধ্যে ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। ইসরায়েলের ইরানের প্রতি সমর্থনকে ইরানীয় সরকার ও জনগণের মধ্যে অতিরিক্ত বিরোধের সূত্রপাত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিক্ষোভের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্রতিবাদকারীরা মুদ্রা অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব ও মৌলিক পণ্যের ঘাটতি নিয়ে সরকারের নীতি সমালোচনা করে। তারা রিয়ালের অবমূল্যায়নকে দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে এক ডলার দিয়ে এখন লক্ষ লক্ষ রিয়াল কেনা সম্ভব নয়।
সরকারি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল করার জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট নীতি প্রকাশ করা হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর মুখে বলা হয়েছে যে অশান্তি দমন করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তবে তা প্রতিবাদকারীদের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে সৃষ্ট অশান্তির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করছেন। ২০২২ সালের বিক্ষোভে দুইশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, আর আজকের বিক্ষোভে ইতিমধ্যে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সমন্বয় সরকারকে আরও কঠিন অবস্থায় ফেলতে পারে।
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর হিজাব নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে গৃহীত কঠোর পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা তখনই শীর্ষে পৌঁছেছিল। এখন রিয়ালের বিশাল অবমূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের সমন্বয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। তেহরানের কিছু অংশে প্রতিবাদকারীরা সড়ক বন্ধ করে দেয়, আর নিরাপত্তা বাহিনী গুলিবিদ্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
ইরানের সরকার এই অশান্তি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুদ্রা স্থিতিশীলকরণের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে, তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা ও নিষেধাজ্ঞা এই পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলছে।
অবশেষে, বর্তমান বিক্ষোভের পরিণতি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি অর্থনৈতিক সংকট অব্যাহত থাকে, তবে সরকারকে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা বা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, নতুবা আরও বড় সামাজিক অশান্তি দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, যেখানে মুদ্রা অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অশান্তি একসাথে দেশের স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের নীতি গৃহীত হবে, তা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



