চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে আজ সকাল ৬:৫৫ টায় একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়া লেখক সুকুমার বৰুৱা আর জীবিত ছিলেন না। ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা বৰুৱা, ৮৭ বছর বয়সে শেষ শ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর কারণ ছিল এক সপ্তাহ আগে ভর্তি হওয়ার পর ফুসফুসে তরল জমা হওয়া এবং তা থেকে উদ্ভূত জটিলতা।
বৰুৱার কন্যা অঞ্জনা বৰুৱা জানান, রোগীকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। শ্বাসযন্ত্রে তরল জমা হওয়ায় চিকিৎসার সময়ই তার মৃত্যু ঘটে।
পরিবারের সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বৰুৱা স্ট্রোকের শিকার হন, যার ফলে ডান পা পঙ্গু হয়ে যায়। সেই সময় থেকে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছেন।
সুকুমার বৰুৱা ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা, মাঝিয়াম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল এবং তিনি স্থানীয় সংস্কৃতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।
১৯৬০-এর দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে টপখানা রোডে একটি ছোট বাড়ি ভাড়া নেন এবং স্বাধীনভাবে ছড়া রচনা শুরু করেন।
তার রচনাগুলি তখনকার জনপ্রিয় শিশু ও কিশোরী প্রকাশনা যেমন কোচিকাচার আশর, খেলাঘর এবং মুকুলের মহফিলে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনাগুলি বৰুৱার ছড়াকে দেশের বিভিন্ন কোণে পৌঁছে দেয়।
বৰুৱা ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোরকিপার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পরও তিনি ছড়া রচনায় সক্রিয় ছিলেন এবং ছয় দশকেরও বেশি সময়ে বাংলা ছড়ার ক্ষেত্রে এক বিশেষ স্থান অর্জন করেন।
তার ছড়াকে “ছড়ারাজ”, “ছড়াশিল্পী” এবং “ছড়াসাম্রাট” উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। বৰুৱার রচনায় ব্যঙ্গ, হাস্যরস, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং রাজনীতির বিষয়বস্তু সমন্বিতভাবে উপস্থিত থাকে।
প্রসিদ্ধ ছড়া সংকলনের মধ্যে রয়েছে “পাগলা ঘোড়া”, “ভিজে বেরাল”, “চন্দনা রঞ্জনার ছড়া”, “এলোপথারি”, “নানা রঙের দিন”, “চিচিং ফাক”, “কিছু না কিছু”, “প্রিয় ছড়া শতক”, “নদীর খেলা”, “ছোটদের হাত”, “যুক্তবর্ণ”, “চন্দনার পাঠশালা” এবং “জীবনের ভিতরে বাইরে”। এই রচনাগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মে পাঠককে মুগ্ধ করেছে।
সাহিত্য ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতিতে সরকার ২০১৭ সালে তাকে একুশে পদক প্রদান করে। এই সম্মান বৰুৱার ছড়ার প্রতি জনসাধারণের ভালোবাসা ও স্বীকৃতির প্রতিফলন।
গত বুধবার বৰুৱার শেষকৃত্য নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ একত্রিত হয়। জনস্রোত তার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। উপস্থিতির বিশালতা তার জীবনের প্রভাব ও জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য দেয়।
সুকুমার বৰুৱা বাংলা ছড়ার জগতে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হবে। তার রচনায় যে মানবিকতা, হাস্যরস এবং দেশপ্রেমের মিশ্রণ রয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলবে।



