পাকিস্তানে ২০২৫ সালে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা পূর্ববছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯৯টি রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে এই হামলাগুলোর ফলে প্রাণহানির হার ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মোট ১,০৩৪ জন নিহত ও ১,৩৬৬ জন আহত হয়েছেন।
এই তথ্যগুলো পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ (পিআইপিএস) প্রকাশিত “পাকিস্তান নিরাপত্তা প্রতিবেদন ২০২৫”‑এর ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এবং বিশ্লেষণ করেছে যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের তীব্রতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরে মোট ১,০৩৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৫৪ জন সাধারণ নাগরিক ছিলেন। বাকি ৬৮০ জনের মৃত্যু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে, যার মধ্যে ২৪৩ জনকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ১,৩৬৬ জনের আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সন্ত্রাসী হামলার ভৌগোলিক বণ্টন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে মোট ঘটনার ৯৫ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে। এই দুই অঞ্চলে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা, পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রমের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
বেসামরিক জনগণও এই সহিংসতার শিকার হয়েছে; বছরের মধ্যে ৩৫৪ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যু গৃহস্থালী এলাকায় বা বাজারে ঘটেছে, যা সমাজের নিরাপত্তা বোধকে ক্ষুণ্ণ করেছে এবং দৈনন্দিন জীবনে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে।
সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরও ধারাবাহিক আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আধা-সামরিক সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলা, গুলিবিদ্ধি এবং গেরিলা কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ২৪৩ জন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে সাইবার রিকনসারেন্স, নগর এলাকায় দ্রুত গতির আক্রমণ এবং সীমানা পারাপার সহজতর করার জন্য গোপন রুট ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত। এসব পরিবর্তন নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে।
সীমান্ত সংঘাতের পাশাপাশি গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। সামরিক ও গৃহযুদ্ধের মিশ্রণ ঘটার ফলে নিরাপত্তা পরিকল্পনা পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
একই সময়ে, একটি আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও ২০২৬ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পুনরায় সংঘাতের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্ভাব্য উত্তেজনা অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে যে, বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতা এবং সম্ভাব্য পার্শ্ববর্তী সংঘাতের ঝুঁকি পাকিস্তানের জন্য ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই সরকারকে নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করে গভীর ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
পিআইপিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে বেলুচিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনগুলো মোকাবিলায় কেবল সামরিক শক্তি নয়, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থানীয় প্রশাসনের শক্তিবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।



