ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ দক্ষিণ কিভুতে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষে গত বছর ডিসেম্বরের শুরুর পর থেকে দেড় হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। সরকার জানায়, ১ ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত এক হাজার পাঁচশো অধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ বা গুলিবিদ্ধের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।
এই হিংসা শুরু হওয়া থেকে মাত্র এক বছর অতিক্রান্ত হলেও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। কঙ্গো সরকারের প্রকাশ্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ক্ষতি প্রধানত কামানিওলা থেকে উভিরা পর্যন্ত অক্ষ বরাবর সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উভিরা, ফিজি ও মওয়েঙ্গা সহ দক্ষিণ কিভুর বেশ কয়েকটি জেলা এখন সরাসরি হিংসার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়ারের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাহীনতার কারণে পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষ তাদের বাসস্থান ত্যাগ করে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলি জানায়, শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী শিবির, খাবার ও মৌলিক চিকিৎসা সেবা অপর্যাপ্ত, ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্রতর হচ্ছে।
সামরিক দিক থেকে, সরকার দাবি করে যে এই অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই হিংসার মূল দায়ী। তারা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং পূর্বে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কঙ্গো সরকার পুনরায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা কঙ্গোর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা বিভাগে একটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, “দক্ষিণ কিভুতে চলমান সহিংসতা কঙ্গোর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা তৎক্ষণাত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।” যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি একই সময়ে উল্লেখ করেছেন, “সংযুক্ত জাতির শান্তি রক্ষাকারী মিশন (MONUSCO)কে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।”
বিশ্লেষকরা এই সংঘাতকে পূর্বের কঙ্গো যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন, তবে সাম্প্রতিক সময়ে গোষ্ঠীগুলোর কৌশলগত পরিবর্তনকে নতুন ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “সামনের মাসগুলোতে যদি ফ্রন্টলাইন আরও দক্ষিণ দিকে সরে যায়, তবে রুইন্ডি ও বুয়ান্ডা সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোও অস্থির হতে পারে, যা পুরো মহাদেশীয় নিরাপত্তা কাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করবে।”
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক বৈঠকে কঙ্গোর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং একটি রেজোলিউশন প্রস্তাবিত হয়েছে, যেখানে MONUSCO-কে অতিরিক্ত সৈন্যবহিনী ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, কঙ্গো সরকারকে জাতীয় সংলাপ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং শরণার্থীদের জন্য টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা গড়ে তুলতে অনুরোধ করা হয়েছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কঙ্গো সরকার এবং প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, যদি এই আলোচনায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহ অব্যাহত থাকে, তবে বেসামরিক মৃত্যুর হার কমে আসতে পারে। তবে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে কোনো চুক্তি না হলে সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে, বিশেষ করে যখন গোষ্ঠীগুলো সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করবে।
সারসংক্ষেপে, দক্ষিণ কিভুতে চলমান সহিংসতা কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া বেসামরিক প্রাণহানি এবং শরণার্থী সংকটের সমাধান কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতে শান্তি রক্ষাকারী মিশনের শক্তিবৃদ্ধি, জাতীয় সংলাপের ত্বরান্বিত করা এবং মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হবে।



