সুকুমার বড়ুয়া, একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার, ৮৮ বছর বয়সে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে গত শুক্রবার সকাল ৭টায় নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মেয়ে অঞ্জনা বড়ুয়া নিশ্চিত করেছেন যে, বাবার স্বাস্থ্যের অবনতি এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্ররের অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয়। পরে তিনি জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে স্থানান্তরিত হন, যেখানে ফুসফুসে তরল জমে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেননি।
সুকুমার বড়ুয়া ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম সর্বানন্দ বড়ুয়া, মায়ের নাম কিরণ বালা বড়ুয়া; পরিবারে তিনি সর্বদা শিক্ষার গুরুত্বের পক্ষে ছিলেন।
তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৯৯ পর্যন্ত স্টোরকিপার পদে কর্মরত ছিলেন, এরপর অবসর গ্রহণের পরও ছড়া রচনায় সক্রিয় ছিলেন।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে অনন্য স্থান গড়ে তুলেছেন। কচি‑কাঁচার আসর, খেলাঘর, মুকুলের মাহফিলসহ বিভিন্ন শিশু‑কিশোর পত্রিকায় তার ছড়া নিয়মিত প্রকাশ পেত, যা ছোটদের কল্পনা জাগিয়ে তুলত।
তার রচনায় শিশুর আনন্দ, কৌতুক ও শিক্ষার মিশ্রণ স্পষ্ট, ফলে বহু প্রজন্মের পাঠক তার ছড়া দিয়ে বড় হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “লেজ আবিষ্কার”, “ছোটদের হাট”, “কোয়াল খাইয়ে”, “ঠিক আছে ঠিক আছে”, “পাগলা ঘোড়া”, “ভিজে বেড়াল”, “চন্দনা রঞ্জনার ছড়া”, “এলোপাতাড়ি”, “নানা রঙের দিন”, “সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া”, “চিচিং ফাঁক”, “কিছু না কিছু”, “প্রিয় ছড়া শতক”, “নদীর খেলা”, “মজার পড়া ১০০ ছড়া”, “সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াসম্ভার (দুই খণ্ড)”, “যুক্তবর্ণ”, “চন্দনার পাঠশালা” এবং “জীবনের ভেতরে বাইরে”।
তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে সরকার একুশে পদক প্রদান করে, যা ভাষা ও সাহিত্যে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি। এছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননা, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, আনন ফাউন্ডেশন আজীবন সম্মাননা এবং চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
সুকুমার বড়ুয়ার মৃত্যু বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার ছড়া এখনও পাঠশালায় ও বাড়িতে শিশুদের মুখে হাসি ফোটায় এবং নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস রয়ে গেছে।
পরিবার ও সমবয়সীরা তার বিদায়ের শোক প্রকাশ করে, এবং স্মৃতিকে সজীব রাখতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মরণসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকাশনা সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তার রচনাগুলোকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুরা তার সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে উপকৃত হতে পারে।



