ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (NHS) কি রোগীদের জন্য জাদু মাশরুমের উপাদান পসিলোসাইবিন ব্যবহার অনুমোদন করবে, এ নিয়ে চিকিৎসক, নিয়ন্ত্রক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে। এই প্রশ্নের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল। রোগের ধরন, চিকিৎসার নিরাপত্তা এবং আইনগত সীমা নির্ধারণের জন্য সরকারী নীতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
ল্যারিসা হোপ, ১৭ বছর বয়সে টেলিভিশন সিরিজ “স্কিনস”ে অভিনয় করার সময় অপ্রত্যাশিত মানসিক আঘাতের সম্মুখীন হন। প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট তার জন্য কাজ না করায় তিনি ক্লিনিক্যাল তত্ত্বাবধানে পসিলোসাইবিনের ছোট ডোজ গ্রহণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে অপ্রত্যাশিতভাবে কাঁদতে বাধ্য করে এবং শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।
ল্যারিসা জানান, সেই মুহূর্তে তিনি নিজের শরীরে “আমি বাড়িতে আছি” এমন এক অনুভূতি পেয়েছিলেন, যা তার জীবনে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ স্বস্তি এনে দেয়। প্রায় দুই দশক পরেও তিনি বিশ্বাস করেন, পসিলোসাইবিন এবং থেরাপির সমন্বয়ই তার আত্মহত্যার চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে সহায়ক হয়েছে।
অন্যদিকে, জুলস ইভান্স, একজন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক, ১৮ বছর বয়সে অবৈধভাবে এলএসডি গ্রহণের পর ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি বর্ণনা করেন, সেই সময় তিনি নিজেকে একটি “ভ্রান্ত” অবস্থায় দেখেন, যেখানে চারপাশের সবাই তাকে সমালোচনা করছে বলে মনে হয়। এই ভয়াবহ অনুভূতি তাকে স্থায়ী মানসিক ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।
ইভান্সের মতে, সেই ট্রিপের পর তিনি সামাজিক উদ্বেগ, প্যানিক আক্রমণ এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) রোগে আক্রান্ত হন। বর্তমানে তিনি “চ্যালেঞ্জিং সাইকেডেলিক এক্সপেরিয়েন্সেস প্রজেক্ট”ের পরিচালক, যেখানে সাইকেডেলিক ব্যবহার পরবর্তী সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীদের সহায়তা প্রদান করা হয়।
এই দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতা চিকিৎসা ক্ষেত্রে পসিলোসাইবিনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলার মূল কারণ। একদিকে রোগীর জীবনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটতে পারে, অন্যদিকে অপ্রত্যাশিত মানসিক ব্যাঘাতের ঝুঁকি থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাইকেডেলিক ওষুধ ডিপ্রেশন, অবসেসিভ‑কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, PTSD, ট্রমা এবং অ্যালকোহল বা জুয়া সংক্রান্ত আসক্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পসিলোসাইবিনের নিয়ন্ত্রিত ডোজ রোগীর মেজাজ উন্নত করে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া লক্ষণ হ্রাস করে দেখানো হয়েছে।
তবে এই গবেষণাগুলি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, এবং বড় স্কেলের র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড স্টাডি প্রয়োজন। বর্তমান আইন অনুযায়ী পসিলোসাইবিন এবং অন্যান্য সাইকেডেলিক ওষুধের ব্যবহার যুক্তরাজ্যে অবৈধ, তাই চিকিৎসা উদ্দেশ্যে এগুলি প্রেসক্রাইব করা যায় না।
ডাক্তারদের মধ্যে কিছুজন যুক্তি দেন, যদি কঠোর ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়, তবে পসিলোসাইবিনকে থেরাপিউটিক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া দাবি করে।
রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, স্বাস্থ্য বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং জনসাধারণের ধারণা বিবেচনা করে নীতি গঠন করা প্রয়োজন। কিছু আইনপ্রণেতা পসিলোসাইবিনের চিকিৎসা গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ আইন প্রণয়নের কথা ভাবছেন।
জনসাধারণের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়; কেউ নতুন থেরাপির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী, আবার কেউ অজানা সাইকেডেলিকের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক।
সুবিধা ও ঝুঁকি উভয়ই বিবেচনা করে, পসিলোসাইবিনের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সীমিত করে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করা হয়।
ইউকে সরকার বর্তমানে কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুমোদন করেছে, যেখানে রোগীর নিরাপত্তা ও ডোজ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই ট্রায়ালগুলো সফল হলে NHS-এ পসিলোসাইবিনের চিকিৎসা প্রয়োগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্যে পসিলোসাইবিনকে নির্দিষ্ট মানসিক রোগের জন্য অনুমোদন করা হয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের জন্য রেফারেন্স হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দেন, সাইকেডেলিক থেরাপি শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত পেশাদারদের তত্ত্বাবধানে, মানসিক মূল্যায়ন ও ফলো-আপ সহকারে প্রদান করা উচিত।
সারসংক্ষেপে, পসিলোসাইবিনের সম্ভাব্য থেরাপিউটিক সুবিধা ও সম্ভাব্য মানসিক ঝুঁকি উভয়ই স্পষ্ট। তাই নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল গবেষণা চালিয়ে যাওয়া এবং ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করা জরুরি।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন, পসিলোসাইবিনকে ভবিষ্যতে NHS-এ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা নিষিদ্ধ রাখা উচিত?



