বাংলাদেশ সরকার আগামী ছয় মাসের জন্য জাতীয় সঞ্চয় সনদের (এনএসসি) সুদের হার কমিয়ে বাজারের বর্তমান হারকে সমন্বয় করেছে। এই পরিবর্তনটি অর্থমন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়। নতুন হারটি গতকাল থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের পর করা নতুন বিনিয়োগে প্রযোজ্য হবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সংশোধিত কাঠামোতে সর্বোচ্চ রিটার্ন ১০.৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন রিটার্ন ৮.৭৪ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। এই হারগুলো বাজারের স্বল্পমেয়াদী সুদের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিনিয়োগকারীর আয়কে সমন্বয় করা লক্ষ্য।
প্রথমে, ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের পর নতুন সঞ্চয় সনদে টাকা জমা করা হলেই এই হ্রাসপ্রাপ্ত হার প্রয়োগ হবে। পূর্বে সনদ ক্রয় করা বিনিয়োগকারীরা তাদের সনদের শর্তে নির্ধারিত পুরনো হারেই রিটার্ন পাবেন, ফলে কোনো ক্ষতি হবে না।
এটি ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ, কারণ এনএসসি হার প্রতি ছয় মাসে একবার পর্যালোচনা করা হয়। ধারাবাহিক হ্রাসের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হল মুদ্রাস্ফীতি ও বাজারের তরলতা নিয়ন্ত্রণে সমতা বজায় রাখা।
নতুন কাঠামোতে ৭.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীকে তুলনামূলকভাবে বেশি রিটার্ন দেওয়া হবে, আর এই সীমা অতিক্রমকারী বিনিয়োগে হার কিছুটা কম থাকবে। এই পার্থক্যটি উচ্চ মূলধনধারী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর মধ্যে সমতা রক্ষা করার জন্য গৃহীত হয়েছে।
বিশেষভাবে, পরিবার সঞ্চয় সনদের সর্বোচ্চ রিটার্ন ১১.৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০.৫৪ শতাংশ করা হয়েছে, যা ৭.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য প্রযোজ্য। এই সনদটি পাঁচ বছরের মেয়াদে সবচেয়ে জনপ্রিয়, তাই হার হ্রাসের ফলে এর চাহিদা প্রভাবিত হতে পারে।
পেনশনার সঞ্চয় সনদে রিটার্ন ১১.৯৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১০.৫৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে, পাঁচ বছরের বাংলাদেশ সঞ্চয় সনদে হার ১১.৮৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০.৪৪ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। উভয়ই ৭.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য প্রযোজ্য।
৭.৫০ লক্ষ টাকার উপরে বিনিয়োগকারীকে এখন ১০.৪১ শতাংশ রিটার্ন প্রদান করা হবে, যা পূর্বের ১১.৮০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। এই হার হ্রাসের ফলে বড় মূলধনধারী বিনিয়োগকারীর আয় কমে যাবে, যা তাদের পোর্টফোলিও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে।
ত্রৈমাসিক সুদভিত্তিক সঞ্চয় সনদেও হার কমে গেছে; ৭.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে এখন ১০.৪৮ শতাংশ এবং সীমা অতিক্রমে ১০.৪৩ শতাংশ রিটার্ন দেওয়া হবে। এই পরিবর্তনটি স্বল্পমেয়াদী সঞ্চয় পণ্যের আকর্ষণকে প্রভাবিত করতে পারে।
বেতনভিত্তিক উন্নয়ন বন্ড (Wage Earner Development Bonds) এর সব স্ল্যাবেই সুদের হার হ্রাস করা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট শতাংশ উল্লেখ করা হয়নি। এই বন্ডগুলো সাধারণত বেতনভুক্ত কর্মীদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত, তাই হার হ্রাসের ফলে তাদের আয়েও প্রভাব পড়বে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, সুদের হার হ্রাসের ফলে সঞ্চয় সনদের তুলনামূলক রিটার্ন কমে যাবে, ফলে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ রিটার্নের বিকল্প যেমন মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ার বা বন্ডে ঝুঁকি নিতে পারেন। তবে, সরকারি সঞ্চয় পণ্যের নিরাপত্তা ও কর সুবিধা এখনও তাদের আকর্ষণ বজায় রাখবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হবে তাদের আর্থিক লক্ষ্য ও ঝুঁকি সহনশীলতা পুনর্মূল্যায়ন করা। যারা স্বল্পমেয়াদে নিরাপদ রিটার্ন চান, তারা এখনও সঞ্চয় সনদে অংশ নিতে পারেন, তবে রিটার্নের হ্রাসকে বিবেচনা করে অতিরিক্ত আয় সৃষ্টির উপায় খুঁজতে হবে।
সারসংক্ষেপে, সরকারী সঞ্চয় সনদের সুদের হার হ্রাস বাজারের বর্তমান সুদের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীর আয়কে কমাবে এবং বিকল্প আর্থিক পণ্যের দিকে মনোযোগ বাড়াবে। ভবিষ্যতে হার পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে, তাই বিনিয়োগকারীর জন্য ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা অপরিহার্য।



