ইউরোপের ব্যাংকিং সেক্টরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্রুত গ্রহণের ফলে কর্মসংস্থানের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মর্গান স্ট্যানলি প্রস্তুত করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের ৩৫টি প্রধান ব্যাংকের মোট কর্মশক্তির প্রায় দশ শতাংশ, অর্থাৎ দুই লক্ষেরও বেশি পদহীন হতে পারে। এই সম্ভাব্য হ্রাসের মূল কারণ হল শাখা বন্ধ এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ানো।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাক-অফিস, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্মতি বিভাগগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে। এই কাজগুলোতে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ এবং রুটিন কাজ জড়িত, যা AI অ্যালগরিদম দ্রুত এবং সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম। ফলে মানবিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
মর্গান স্ট্যানলির রিপোর্টে AI গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো গড়ে ৩০ শতাংশ দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে খরচ কমে যাবে এবং সেবা গতি বাড়বে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সুবিধা এনে দেবে। তবে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
ইউরোপের বাইরে এই প্রবণতা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্স অক্টোবর মাসে তার কর্মীদের জানিয়েছে যে, AI চালিত প্রকল্প “OneGS 3.0” এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত নিয়োগ বন্ধ এবং কিছু পদ ছাঁটাই করা হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ক্লায়েন্ট অনবোর্ডিং থেকে নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং পর্যন্ত সব প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা আনা।
ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ইতিমধ্যে কর্মী হ্রাসের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। নেদারল্যান্ডের ABN আম্রো ২০২৮ সালের মধ্যে তার কর্মশক্তির পঞ্চমাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সময়ে ফ্রান্সের সোসাইটি জেনেরাল তার সিইওর মন্তব্যে উল্লেখ করেছে যে, ব্যাংকিংয়ের কোনো প্রক্রিয়াই অপরিবর্তনীয় নয়।
এই পরিবর্তনের প্রতি কিছু ব্যাংকিং নেতার সতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে। জেপি মরগান চেজের এক নির্বাহী জোর দিয়ে বলেছেন যে, তরুণ ব্যাংক কর্মীরা যদি মৌলিক আর্থিক জ্ঞান শিখতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে শিল্পের জন্য বড় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তিনি এই বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সঙ্গে শেয়ার করেছেন।
AI-র দ্রুত অগ্রগতি ব্যাংকিং সেক্টরের কাজের পদ্ধতিকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে পারে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে ডেটা বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সম্মতি দ্রুত সম্পন্ন হবে, যা ঐতিহ্যবাহী ব্যাক-অফিসের কাজকে কম প্রয়োজনীয় করে তুলবে।
অন্যদিকে, শাখা বন্ধের ফলে শারীরিক উপস্থিতি কমে যাবে, ফলে গ্রাহক সেবার মডেলও ডিজিটাল দিকে ঝুঁকবে। ব্যাংকগুলো মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবা প্রদান বাড়াতে পারে, যা গ্রাহকের অভিজ্ঞতা উন্নত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু কর্মসংস্থান হ্রাসের ফলে সামাজিক প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না। দুই লক্ষেরও বেশি চাকরি হারানোর সম্ভাবনা কর্মী বাজারে চাপ বাড়াবে এবং বিশেষ করে ব্যাক-অফিসে কাজ করা কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে।
বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে পুনঃদক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করেছে। তবে এই প্রশিক্ষণগুলো কতটা কার্যকর হবে এবং কর্মীদের নতুন ভূমিকা গ্রহণে কতটা সহায়তা করবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপীয় ব্যাংকিং সেক্টরে AI গ্রহণের ফলে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং খরচ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তবে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ দক্ষতার গঠন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে AI-র প্রভাব আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন, তাই ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। এই ভারসাম্য না রক্ষলে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বে প্রভাব পড়তে পারে।



