নির্বাচন শেষে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের পর, প্রধানমন্ত্রী‑সদৃশ প্রধান উপদেষ্টা পদে কাজ করা মুহাম্মদ ইউনূস তার পূর্বের পেশাগত দায়িত্বে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন। এই কথা তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সর্দার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে বুধবার রাষ্ট্র অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতে প্রকাশ করেন। সাক্ষাতের পর, ইউনূসের দপ্তর বৃহস্পতিবার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে তার এই পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে জানায়।
ইউনূসের দপ্তরের বিবরণে বলা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর তিনি অর্থনীতিবিদ ও টেকসই উন্নয়নের পণ্ডিত হিসেবে তার “থ্রি জিরো” তত্ত্বের বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করবেন। তত্ত্বটি দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং কার্বন নিঃসরণকে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সেমিনারে তার বক্তৃতা শোনা যায়।
“থ্রি জিরো” তত্ত্বের মূল ভিত্তি তিনটি শূন্য লক্ষ্য: শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ। ইউনূসের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুব শক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি, স্বচ্ছ শাসন এবং সামাজিক ব্যবসার সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি পূর্বে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বহুবার আলোচনা করেছেন এবং তত্ত্বটি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইউনূসের বর্তমান দায়িত্বের পাশাপাশি, তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। গত বুধবার, খালেদা জিয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে তিনি সার্কের চেতনা ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, “সার্কের চেতনা এখনো জীবিত ও দৃঢ়” এবং সদস্য দেশগুলোর সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখে তিনি গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন।
খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা যে সম্মানসূচক আচরণ প্রদর্শন করেছে, তা ইউনূসের দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সার্কের সদস্য দেশগুলো যে সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছে, তা আমাদের আঞ্চলিক ঐক্যের প্রতীক।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সার্কের পুনরুজ্জীবন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তের দিকে ইঙ্গিত করেন।
ইউনূসের এই প্রকাশনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে। তিনি ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, ২৪ আন্দোলনের পর ছাত্রদের আহ্বানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখন তিনি নির্বাচনের পর তার পেশাগত দায়িত্বে ফিরে গিয়ে টেকসই উন্নয়নের নীতি বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে চান। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অর্থনৈতিক নীতি, সামাজিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার দিক থেকে কী পরিবর্তন আসবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের নজরে থাকবে।
অধিকন্তু, ইউনূসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। “থ্রি জিরো” তত্ত্বের বাস্তবায়ন যদি সফল হয়, তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার কমে যাবে এবং পরিবেশগত দায়িত্বও বাড়বে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বয় করতে হবে।
সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে ইউনূসের মন্তব্যের পর, আঞ্চলিক দেশগুলোতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। তিনি যে বৈঠকে অংশ নেন, তা শুধু শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি মঞ্চ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে সার্কের কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে ইউনূসের জোরালো আহ্বান আঞ্চলিক সংহতি ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
সর্বোপরি, নির্বাচনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের পেশাগত ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং তার “থ্রি জিরো” তত্ত্বের উপর জোর দেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে। একই সঙ্গে, সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে তার মন্তব্য আঞ্চলিক সহযোগিতার পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এই developments গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।



