ঢাকা, ১ জানুয়ারি – ২০২৪ আর্থিক বছরের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক DSEX গত বছর ৬.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শেয়ারবাজারের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল দেখিয়েছে। একই সময়ে, দেশের শেয়ারবাজারে সর্বোচ্চ লভ্যাংশের হার থাকলেও, কর্পোরেট আয় বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের ২০২৪ পারফরম্যান্স রিভিউ অনুযায়ী, বছরের পুরো সময়ে লেনদেনের পরিমাণ কমে গিয়েছিল, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও দুর্বল আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতি গ্লোবাল ও দেশীয় দু’ধরনের চাপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি, আন্তর্জাতিক সংঘাত, ব্যাংকিং সেক্টরের চাপ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্তর্ভুক্ত।
ম্যাক্রোইকোনমিক সূচকগুলোতে কিছু উন্নতি দেখা গেলেও, যেমন সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা, তবে ব্যাংকিং সংস্কার ও নন-পারফর্মিং লোন (NPL) দ্রুত বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীর আস্থা এখনও সীমিত রয়ে গেছে।
বছরের প্রথম নয় মাসে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট আয় প্রায় ৪২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পতন। এই হ্রাসের প্রধান কারণ ছিল বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের দুর্বল ফলাফল।
ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি বিনিয়োগকারীর মনোভাব অত্যন্ত সতর্ক, কারণ সাম্প্রতিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, ব্যবসায়িক বৃদ্ধির ধীরগতি এবং উচ্চ NPL স্তরকে নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এই উদ্বেগই শেয়ারবাজারে ব্যাংকিং শেয়ারের মূল্য হ্রাসের একটি বড় কারণ।
নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (NBFI) সেক্টরের শেয়ারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে; পুরো বছর জুড়ে গড়ে ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই সেক্টরের শেয়ারমূল্যের পতন মূলত দুর্বল আয় ও ঋণ পুনরুদ্ধার সমস্যার ফলে ঘটেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় বাংলাদেশ শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নিম্নমানের। একই সময়ে, ভারতের BSE সেন্সেক্স ৮.৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, পাকিস্তানের KSE সূচক ৪৫ শতাংশ, এবং শ্রীলঙ্কার CSE অল সূচক ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এশিয়ার অন্যান্য বাজারের মধ্যে ভিয়েতনামের VNI সূচক ৩৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার JCI সূচক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে থাইল্যান্ডের SET সূচক ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বাংলাদেশকে ছাড়া একমাত্র বড় হ্রাসকারী সূচক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের নিম্নগতি সত্ত্বেও, কিছু ব্যাংক শক্তিশালী আয় প্রকাশের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। তবে এই ইতিবাচক ফলাফলগুলো সামগ্রিক বাজারের মন্দা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
ব্র্যাক ইপিএল রিভিউতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেয়ারবাজারের তরলতা ও লেনদেনের পরিমাণের ধারাবাহিক হ্রাস ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যখন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় নীতি পরিবর্তনগুলো অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, ব্যাংকিং সেক্টরের NPL বাড়তে থাকলে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে অগ্রসর হলে, শেয়ারবাজারের পুনরুদ্ধার সময়সাপেক্ষ হতে পারে। একই সঙ্গে, মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা ও সুদের হারের নিয়ন্ত্রণে উন্নতি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্স দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় সর্বনিম্ন ছিল, যা মূলত ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের আয় হ্রাস ও উচ্চ NPL স্তরের কারণে ঘটেছে। ভবিষ্যতে বাজারের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য ব্যাংকিং সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।



