বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার পৌঁছেছে, যা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ মাত্রা। এই পরিমাণ পূর্ববছরের ২৬.৮৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে।
বছরের শেষ মাসে, ডিসেম্বরের রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩.২২ বিলিয়ন ডলারে রেকর্ড হয়েছে। এই সংখ্যা পূর্ববছরের একই মাসের তুলনায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ফলে, বছরের শেষের দিকে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে তীব্র প্রবাহ দেখা গেছে।
রেমিট্যান্সের এই উত্থান দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের বৃদ্ধি মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং ডলার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি মুদ্রা প্রবাহের ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাবে, যা সামগ্রিক পেমেন্ট ব্যালান্সকে উন্নত করবে।
বহিরাগত মুদ্রা প্রবাহের ফলে গৃহস্থালী খরচের ক্ষমতা বাড়বে। রেমিট্যান্স প্রাপ্ত পরিবারগুলো সাধারণত ভোগ্যপণ্যের ক্রয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বাড়ায়, ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ত্বরান্বিত হয়। এই প্রবাহের ফলে রিয়েল এস্টেট, গৃহসজ্জা ও গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি বাজারে ত্বরিত বিকাশের সম্ভাবনা দেখা যায়।
বিনিয়োগের দিক থেকে, রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন তহবিলের উৎস তৈরি করে। ব্যাংকগুলো এই তহবিলকে ঋণ প্রদানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (SME) সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। ফলে, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি কিছু ঝুঁকিও নিয়ে আসে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রা বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর দেশের নীতি পরিবর্তন রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে, প্রধান রেমিট্যান্স উৎস দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতি ও মুদ্রা নীতি পরিবর্তন হলে প্রবাহে হ্রাসের সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিট্যান্সের প্রবাহকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। রেমিট্যান্সের দ্রুত ও সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ, ট্রান্সফার ফি কমানো এবং রেমিট্যান্সের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য কর সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো রেমিট্যান্সের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের মুদ্রা সাপ্লাইকে সমর্থন করবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তবে, মুদ্রা সাপ্লাই অতিরিক্ত বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতি সমন্বয় করে সতর্ক থাকতে হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফিনটেক কোম্পানিগুলোর শেয়ার মূল্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা রেমিট্যান্সের স্থিতিশীল প্রবাহকে দেশের আর্থিক খাতের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, যা শেয়ারবাজারে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের প্রবাহকে টেকসই করতে, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে তারা উচ্চ বেতন অর্জন করতে পারবে, ফলে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়বে। সরকার এই দিকটি উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ ও সনদপ্রাপ্তি প্রোগ্রাম চালু করেছে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে রেমিট্যান্সের সর্বোচ্চ প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়, পেমেন্ট ব্যালান্স এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রা হার পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নীতি সমন্বয় ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। রেমিট্যান্সকে টেকসই বৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



