ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া নতুন বছরের সূচনা থেকেই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, শীতের রাতের শেষের দিকে রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনী ২০০টিরও বেশি ড্রোন উড়িয়ে ইউক্রেনের জ্বালানি সিস্টেমে আঘাত হানেছে। এই আক্রমণগুলো দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটাতে লক্ষ্যভেদ করে চালানো হয়।
ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস স্টেশন এবং ট্রান্সমিশন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের এনার্জি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রমণের ফলে কিছু অঞ্চলে রাতের বেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তদুপরি, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের কারণে জরুরি সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীকে অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে।
জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধকে নতুন বছরের মধ্যে টেনে নিয়ে দেশের নাগরিকদের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। তিনি বলেন, শীতের ছুটির সময়ে এমন আক্রমণ চালিয়ে রাশিয়া আন্তর্জাতিক সমর্থনকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এই মন্তব্যের পর সরকার তৎক্ষণাৎ জরুরি বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ও বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
যুদ্ধের সূচনা হয় ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ, এবং এখন প্রায় চার বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে এবং অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে চলেছে এবং ইউক্রেনকে সামরিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো সাম্প্রতিক সপ্তাহে ইউক্রেনকে অতিরিক্ত রকেট সিস্টেম ও ডিফেন্স টেকনোলজি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা রাশিয়ার ড্রোন আক্রমণের মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তারা রাশিয়ার এই নতুন বছরের আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছেন।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্টন ভাসিলেভের মতে, রাশিয়ার লক্ষ্য কেবল সামরিক জয় নয়, বরং ইউক্রেনের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল করে দেশীয় অর্থনীতিকে চাপিয়ে দেওয়া। তিনি যুক্তি দেন, শীতকালে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়লে জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়বে এবং সরকারকে আলোচনায় বেশি নমনীয় হতে বাধ্য করবে। তবে, ইউক্রেনের শক্তি সংরক্ষণ নীতি এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন এই কৌশলকে সীমিত করতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, রাশিয়া এই আক্রমণকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেনি, ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নিন্দা ও উদ্বেগের মাত্রা বাড়ছে। ইউক্রেনের সরকার ড্রোন হুমকির মোকাবেলায় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করার দাবি জানিয়েছে এবং শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে অতিরিক্ত সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তী সপ্তাহে ইউক্রেনের রাজধানী কীভে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরাম অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধান ও মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি ড্রোন আক্রমণ অব্যাহত থাকে তবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শীতের তীব্রতায় জনসাধারণের দুর্ভোগ বাড়বে। তাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপই এই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার একমাত্র উপায় হতে পারে।



