বাংলাদেশ ও ভারতের জলসম্পদ সংস্থাগুলো আজ গঙ্গা ও পদ্মা নদীর জলের স্তর পরিমাপের যৌথ কাজ শুরু করেছে, যা ৩০ বছর পুরনো গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির শেষ বছরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দুই দেশের দল সকালবেলা পদ্মা নদীর হার্ডিং ব্রিজের ৩,৫০০ ফুট উপরে একটি নির্ধারিত স্থানে মাপ নেওয়া শুরু করেছে; একই সঙ্গে ফারাক্কা পয়েন্টে জলের পরিমাণ রেকর্ড করা হচ্ছে।
ভারতীয় দলটি দুইজন সদস্য নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে সওরভ কুমার, সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং সানি অরোরা, সহকারী ডিরেক্টর অন্তর্ভুক্ত। তারা বাংলাদেশে পৌঁছেছেন এবং মাপের কাজের জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে, বাংলাদেশীয় দলটি চারজন সদস্যের, যার নেতৃত্বে মি. আরিফিন জুবায়েদ, নর্থ-ইস্টার্ন মেজারমেন্ট হাইড্রোলজি ডিভিশনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, এবং তিনি ভারতের ফারাক্কা পয়েন্টে মাপ নেওয়ার জন্য দল নিয়ে গেছেন।
পদ্মা নদীর হার্ডিং ব্রিজের উপরে মাপ নেওয়া স্থানটি ৩,৫০০ ফুট উপরে অবস্থিত, যা উভয় দেশের হাইড্রোলজি বিভাগকে জলের প্রবাহের সঠিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে। ফারাক্কা পয়েন্টে মাপের কাজও একই সময়ে শুরু হয়েছে, যা চুক্তিতে নির্ধারিত শর্তাবলীর ভিত্তিতে জলবণ্টনের হিসাবের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের পাবনা জেলায় হাইড্রোলজি বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মো. শিব্বের হোসেন উল্লেখ করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, জলসম্পদ মন্ত্রণালয় হোম মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি পাঠিয়ে ভারতীয় দলের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নির্ধারিত স্থানে প্রতি দশ দিনে একবার জলের স্তর রেকর্ড করবে। এই রেকর্ডিং চুক্তিতে নির্ধারিত শর্তাবলীর ভিত্তিতে জলবণ্টন নির্ধারণে ব্যবহৃত হবে। ফারাক্কা পয়েন্টে প্রবাহের পরিমাণ ৭০,০০০ কিউসেকের নিচে হলে উভয় দেশ সমান ভাগ পাবে। প্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ ন্যূনতম ৩৫,০০০ কিউসেক পাবে, বাকি পরিমাণ ভারতকে বরাদ্দ হবে। প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হলে ভারত ন্যূনতম ৪০,০০০ কিউসেক পাবে, অবশিষ্ট জল বাংলাদেশে যাবে।
অতিরিক্তভাবে, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত প্রতি মাসের তিনটি দশ-দিনের চক্রের মধ্যে একবার উভয় দেশ ন্যূনতম ৩৫,০০০ কিউসেক পানির অধিকার পাবে। এই ধারাটি চুক্তির বিশেষ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত, যা উভয় দেশের কৃষি ও শিল্পখাতে জল সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গঙ্গা-গোয়ালপাড়া চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার জলের ভাগাভাগি মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে, তবে শেষ বছরের এই পরিমাপগুলো চুক্তির কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ রূপান্তরের সূচক হতে পারে। “এই ধরনের যৌথ পরিমাপ শুধু ডেটা সংগ্রহই নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া,” একজন আন্তর্জাতিক জলসম্পদ বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন।
গঙ্গা ও পদ্মা নদীর জলের ভাগাভাগি বিষয়টি পূর্বে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সংবেদনশীল বিষয় ছিল। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি পরবর্তী দশকে দু’দেশের মধ্যে বহুবার আলোচনার বিষয় হয়েছে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহের হ্রাস এবং কৃষি চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। এখন চুক্তির শেষ বছরে এই যৌথ পরিমাপের মাধ্যমে উভয় পক্ষের প্রত্যাশা স্পষ্ট হবে এবং পরবর্তী পুনর্নবীকরণ বা সংশোধনের ভিত্তি তৈরি হবে।
বাংলাদেশ গত ত্রিশ বছর ধরে চুক্তির অধীনে গঙ্গা ও পদ্মা থেকে নির্ধারিত পরিমাণের জল পেয়ে আসছে। এই সময়ে দেশটি কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে ধান ও ইলিশ চাষে জল সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে জলবণ্টনের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে চুক্তির শর্তাবলীতে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন হতে পারে।
দুই দেশের হাইড্রোলজি দল আগামী কয়েক মাসে নির্ধারিত দশ-দিনের চক্রে মাপ চালিয়ে যাবে এবং ফলাফলগুলো চুক্তির বিধান অনুযায়ী বিশ্লেষণ করবে। এই তথ্যগুলো উভয় দেশের জলসম্পদ মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে প্রেরণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ জলবণ্টন নীতি গঠন ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা উন্নত করা যায়।
গঙ্গা-গোয়ালপাড়া চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর চুক্তির সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেমন ইন্দাসের পানি ভাগাভাগি চুক্তি এবং মেকং নদীর বহু-দেশীয় সমঝোতা। এসব চুক্তি প্রায়ই জলবণ্টনের ন্যায্যতা, পরিবেশগত টেকসইতা এবং পার্শ্ববর্তী দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য জটিল আলোচনার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। গঙ্গা-গোয়ালপাড়া চুক্তি তার সরলতা ও স্পষ্ট শর্তের জন্য প্রশংসিত, তবে শেষ বছরের এই পরিমাপগুলো চুক্তির কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ দেবে।
সারসংক্ষেপে, আজকের যৌথ পরিমাপ গঙ্গা ও পদ্মা নদীর জলের ভাগাভাগি চুক্তির শেষ বছরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা উভয় দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃঢ়তা পরীক্ষা করবে। পরবর্তী মাসগুলোতে সংগৃহীত ডেটা চুক্তির পুনর্নবীকরণ বা সংশোধনের ভিত্তি হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার জলসম্পদ নীতিতে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে।



