উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে গড়ে ওঠা সামরিক জোটকে অপরাজেয় বলে বর্ণনা করেছেন এবং বিদেশে লড়াইরত তার সৈন্যদের বীরত্বের প্রশংসা করেছেন। এই বার্তা সিউল ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিমের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল দেশের উৎসবমুখর পরিবেশে বিদেশে যুদ্ধরত সৈন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং রাশিয়ার সঙ্গে জোটকে আরও দৃঢ় করার আহ্বান।
দক্ষিণ কোরিয়া এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার ইউক্রেনের চার বছরের আক্রমণকে সমর্থন করতে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে। এই সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ং সরকার রাশিয়ার সামরিক অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৬০০ উত্তর কোরিয়ান সৈন্য নিহত হয়েছে এবং আরও কয়েক হাজার সৈন্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই সংখ্যা যুদ্ধক্ষেত্রে শিকার হওয়া উত্তর কোরিয়ান সৈন্যদের মানবিক ক্ষতির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে রাশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়াকে আর্থিক সহায়তা, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পারস্পরিক সুবিধা উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থকে শক্তিশালী করছে বলে ধারণা করা হয়।
রাষ্ট্রীয় কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) কিমের বার্তাকে পুরোপুরি তুলে ধরেছে এবং বিদেশে যুদ্ধরত সৈন্যদের বীরত্বের জন্য সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করেছে। কেসিএনএ রিপোর্টে কিমের উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে যে, “নববর্ষের আনন্দময় মুহূর্তে তোমাদের সাহসিকতা আমাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে।”
কিমের বার্তায় তিনি সৈন্যদেরকে রাশিয়ার জনগণের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি বজায় রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে গড়ে ওঠা এই জোটকে “অপরাজেয়” হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নববর্ষের উপলক্ষে পিয়ংইয়ংয়ের মে ডে স্টেডিয়ামে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কিমের ভাষণ অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া ব্যাপকভাবে কভারেজ প্রদান করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট উত্তর কোরিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার নতুন পথ খুলে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সুযোগ তৈরি করেছে। এই কৌশলগত অবস্থান কিমের সরকারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে সহায়তা করে।
কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম ইউল-চুল এএফপিকে উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এখন উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা নীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে প্রাপ্ত আর্থিক ও সামরিক সুবিধা দেশীয় জনমতকে জাতীয়তাবাদী রঙে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, কিমের বার্তা শুধুমাত্র সৈন্যদের প্রশংসা নয়, বরং রাশিয়ার সঙ্গে জোটকে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ধরনের প্রকাশনা দেশীয় জনগণের মধ্যে রাশিয়ার প্রতি ইতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়। ইউরোপের সর্বাধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর একটিতে যুক্ত হওয়া উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে জোটের দৃঢ়তা ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক বিকল্পকে সীমিত করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সংলাপের দরজা আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, রাশিয়ার সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে উত্তর কোরিয়ার স্বনির্ভরতা বাড়াতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, কিমের নববর্ষের বার্তা রাশিয়ার সঙ্গে অপরাজেয় জোটের প্রশংসা এবং বিদেশে লড়াইরত সৈন্যদের বীরত্বের স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই বার্তা দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় গর্ব জাগ্রত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।



