শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, গত বছর দেশের মুদ্রাস্ফীতি মাত্র ২.১ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, যা নির্ধারিত পাঁচ শতাংশের লক্ষ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই হ্রাসের পরেও ব্যাংক ২০২৬ সালের দিকে মুদ্রাস্ফীতির ধীরে ধীরে ত্বরান্বিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।
কলম্বো ভোক্তা মূল্য সূচক (CCPI) ডিসেম্বর মাসে ১৯৫.৮ এ পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ১৯১.৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২.১ শতাংশের ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে। এই সূচক শ্রীলঙ্কার মুদ্রাস্ফীতির প্রধান পরিমাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কম মুদ্রাস্ফীতি ভোক্তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য থেকে নিচে থাকা অর্থনৈতিক চাহিদার দুর্বলতা ও ব্যয় সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। চাহিদা হ্রাসের ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি ধীর হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে প্রভাবিত করতে পারে।
শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালে তার সর্বোচ্চ আর্থিক সংকটে পৌঁছেছিল, যখন বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভ শেষ হয়ে গিয়ে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সময়ের সংকটের পর থেকে দেশটি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
নভেম্বর মাসে দেশের ওপর ধ্বংসাত্মক সাইক্লোনের আঘাত লেগেছিল, যার ফলে কমপক্ষে ৬৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৮৩ জন এখনও অদৃশ্য। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের জনসংখ্যার দশ শতাংশেরও বেশি মানুষকে প্রভাবিত করেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাইক্লোনের ফলে ভবন ও কৃষি খাতে সরাসরি ক্ষতি প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ক্ষতি দেশের অবকাঠামো ও উৎপাদনশীলতার ওপর বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, নভেম্বর ২০২৫ থেকে মুদ্রাস্ফীতির ধীরে ধীরে ত্বরান্বিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাবে, যা শেষ পর্যন্ত পাঁচ শতাংশের লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হবে। এই পূর্বাভাসের ভিত্তি বর্তমান অর্থনৈতিক সূচক ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা।
আর্থিক সহায়তার অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে ২০৬ মিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ গ্রহণ করেছে, যা সাইক্লোনের পরিপ্রেক্ষিতে ত্রাণমূলক খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হবে।
এর পাশাপাশি, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে IMF-র সঙ্গে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের বড় বেলআউট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়, যা দেশের দুর্বল আর্থিক অবস্থাকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই তহবিলের মাধ্যমে মুদ্রা রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, ঋণ পুনর্গঠন এবং মৌলিক সেবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করছেন যে, ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল দেশের আর্থিক নীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা আনতে পারে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। নির্বাচনের পর বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং নীতি পরিবর্তন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে, শ্রীলঙ্কা বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিণতি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে চাহিদার দুর্বলতা, ঋণভার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে, যা নীতিনির্ধারকদের সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।



