বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা ২০২১-২২ আর্থিক বছরের পর থেকে প্রথমবারের মতো তিন বছরের মধ্যে অর্জিত হয়েছে। এই বৃদ্ধি দেশের আমদানি বিলের দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর গণনা পদ্ধতি অনুসারে, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ২৮.৫১ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা এক সপ্তাহ আগে থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি খরচ মেটাতে পারবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাসিক আমদানি বিল বর্তমানে ৫.৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা রিজার্ভের ব্যবহারযোগ্য অংশের সঙ্গে তুলনা করলে প্রায় পাঁচ মাসের কভারেজ নিশ্চিত করে। এই পরিসংখ্যান রিজার্ভের পর্যাপ্ততা এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা উভয়ই নির্দেশ করে।
রিজার্ভের শীর্ষে পৌঁছানোর পূর্বে, আগস্ট ২০২১-এ রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল। তবে কোভিড-১৯ সীমাবদ্ধতা হ্রাস এবং ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের ফলে পণ্য দামের উত্থান ঘটার পর আমদানি চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভে অবনতি দেখা যায়।
মে ২০২৪-এ মোট ডলার স্টক ২৪ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা আন্তর্জাতিক পেমেন্টের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। রিজার্ভের হ্রাসের ফলে মুদ্রা বাজারে টাকার ঘাটতি এবং মুদ্রা মূল্যের অবনতি সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল।
অগাস্ট ২০২৩-এ সরকার পরিবর্তনের পর রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়, যা রিজার্ভের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ রিজার্ভের ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং মুদ্রা বাজারে স্বস্তি প্রদান করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে ডলার বিক্রি করছিল, তবে ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের শুরু থেকে ব্যাংক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার ক্রয় শুরু করে টাকার অবমূল্যায়ন রোধের চেষ্টা করছে। এই নীতি পরিবর্তন রিজার্ভের গঠনকে সমর্থন করে।
এই আর্থিক বছরে ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে, যা রিজার্ভের বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে মুদ্রা বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ কমে এবং টাকার মান স্থিতিশীল থাকে।
জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বছরে ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রেমিট্যান্সের এই উত্থান রিজার্ভের পুনরুদ্ধারে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
একই সময়ে রপ্তানি কিছুটা বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে আমদানি ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক বাণিজ্যিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। রপ্তানি ও আমদানি উভয়েরই বৃদ্ধি রিজার্ভের ব্যবহারযোগ্যতা এবং মুদ্রা নীতির সমন্বয় প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের এই উন্নতি দেশের মুদ্রা বাজারে আস্থা বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত প্রদান করেছে। তবে আমদানি চাহিদা দ্রুত বাড়লে রিজার্ভের চাপ বাড়তে পারে, তাই রিজার্ভের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
ভবিষ্যতে রিজার্ভের স্তর ৩৩ বিলিয়ন ডলারের উপরে স্থিত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে বৈশ্বিক পণ্যের দামের অস্থিরতা, সুদের হার পরিবর্তন এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহের অনিশ্চয়তা রিজার্ভের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই মুদ্রা নীতি ও বাণিজ্যিক কৌশলকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, রিজার্ভের পুনরুদ্ধার দেশের আমদানি পরিশোধের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা এনেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক ভিত্তি স্থাপন করেছে, তবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক নীতি প্রয়োগ অপরিহার্য।



