৩১ ডিসেম্বর, বুধবার সকাল ১০:৩০ টায় ওড়িশার চাঁদিপুর উপকূলের ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জে ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তৈরি স্বল্প পাল্লার আধা‑ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রলয়’ এর জোড়া উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করে। একই লঞ্চার থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় এবং উভয়ই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে আঘাত হানে।
এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল স্যালভো লঞ্চের সক্ষমতা যাচাই করা, যেখানে এক লঞ্চার থেকে দ্রুত পরপর দুটো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। উভয় ক্ষেপণাস্ত্রই বঙ্গোপসাগরে নির্ধারিত স্থানে সফলভাবে অবতরণ করে, যা ডিআরডিওর প্রযুক্তিগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং নির্ভুলতা প্রমাণ করে।
‘প্রলয়’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ডিআরডিওর সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ গবেষণা ও উন্নয়নের ফল। এটি একটি সারফেস‑টু‑এয়ার (S‑to‑A) বা ভূমি‑থেকে‑আকাশমুখী আধা‑ব্যালিস্টিক সিস্টেম, যা স্বল্প পাল্লার (১৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার) যেকোনো লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। উন্নত লিড‑প্রোপেল্যান্ট এবং আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেমের সংমিশ্রণে এই অস্ত্রটি লক্ষ্যভেদে উচ্চ নির্ভুলতা অর্জন করে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘প্রলয়’ এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার মধ্য‑আকাশে গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা। এই বৈশিষ্ট্যটি শত্রু ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সহায়তা করে, ফলে আধুনিক যুদ্ধের কৌশলে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
পরীক্ষার সময় ডিআরডিওর শীর্ষ বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতীয় স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি পরীক্ষার গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে সংযোগকে তুলে ধরে।
ডিআরডিও সূত্রে জানা যায়, ‘প্রলয়’ এর নেভিগেশন সিস্টেমে জিপিএস এবং ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিটের সমন্বয় ব্যবহার করা হয়েছে, যা লক্ষ্যভেদে অব্যর্থতা নিশ্চিত করে। এছাড়া লিড‑প্রোপেল্যান্টের গুণগত মান উচ্চ শক্তি ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে, ফলে দীর্ঘ দূরত্বে সঠিক গতি বজায় রাখা সম্ভব হয়।
এই জোড়া উৎক্ষেপণের সফলতা ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জরুরি সামরিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে ‘প্রলয়’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, কারণ এটি দ্রুত মোবিলাইজেশন এবং সুনির্দিষ্ট আঘাতের সুযোগ দেয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং পরীক্ষার পর ডিআরডিও ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের প্রশংসা করে জানিয়েছেন, এই সফল জোড়া উৎক্ষেপণ প্রমাণ করে যে ‘প্রলয়’ এখন পূর্ণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্ত্রের উন্নয়ন দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বনির্ভরতা বাড়ায়।
ডিআরডিওর গবেষণা দল ‘প্রলয়’ এর উন্নয়নে বহু বছর ধরে কাজ করেছে। প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে প্রোটোটাইপ তৈরি, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ এবং শেষ পর্যন্ত স্যালভো লঞ্চের সফলতা অর্জন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় দেশীয় প্রযুক্তি ও উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।
‘প্রলয়’ এর রেঞ্জ ১৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম, যা সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এর স্বল্প পাল্লা এবং উচ্চ গতি শত্রু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করতে সহায়তা করে।
এই পরীক্ষার ফলাফল ডিআরডিওকে ভবিষ্যতে আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করার ভিত্তি প্রদান করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত গাইডেন্স সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ক্ষমতা যুক্ত করা হবে, যাতে যুদ্ধের জটিল পরিবেশে আরও কার্যকরী হয়।
সারসংক্ষেপে, ৩১ ডিসেম্বর চাঁদিপুরে সম্পন্ন জোড়া উৎক্ষেপণ ভারতীয় স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রলয়’ এর প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন এবং কৌশলগত গুরুত্বকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে। এই সাফল্য দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের স্বনির্ভরতা বাড়িয়ে তুলবে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



