বছরের শুরুর দিকে ভারতীয় কূটনীতিক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জামায়াত ইসলামী আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন। সাক্ষাৎটি গোপন রাখার অনুরোধের সঙ্গে হয়, যাতে প্রকাশ্য আলোচনায় কোনো প্রভাব না পড়ে। এই সাক্ষাৎটি দিল্লিতে নয়, জামায়াতের নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনায় ১৩তম সংসদীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য জোটের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একতাবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে মত বিনিময় করেন। কূটনীতিক জামায়াতকে অনুরোধ করেন, যাতে এই তথ্য রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে প্রকাশ না করা হয়।
শফিকুর রহমান জোট গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং পাঁচ বছরের বেশি সময়ের জন্য দেশের শাসনব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে চাওয়ার কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, যদি সব দল একমত হয়, তবে একসাথে দেশের শাসন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এই বক্তব্যে তিনি জোটের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শাসনকালে সমন্বয়কে মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
২৮ ডিসেম্বর জামায়াতসহ আটটি রাজনৈতিক দল একটি নতুন জোটে যুক্ত হয়, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপি জুলাই আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সমর্থনে গঠিত একটি দল, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন শক্তি যোগায়। এই জোটে যুক্ত হওয়ার পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার বাসভবনে একটি সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে তিনি জোটের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন।
রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিরোনাম ছিল “বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দল ঐকমত্যের সরকার গঠনে রাজি”। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জামায়াতের আমির জোটের অংশ হিসেবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একসাথে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জোর দেন। তিনি বলেন, কোনো ঐকমত্যের সরকার গঠিত হলেও সবার জন্য স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত ইসলামী বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকারে ছিল এবং সেই সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করে। ঐ সময়ের অভিজ্ঞতা জামায়াতকে এখনো রাজনৈতিক মঞ্চে প্রভাবশালী করে তুলেছে। তবে শফিকুর রহমান জোটের রূপরেখা পুনরায় ব্যাখ্যা করে বলেন, সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্ত দল থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে এবং জামায়াতের জয় হলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় সমিতি থেকে নেওয়া হবে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জামায়াতের রাজনৈতিক পুনরুত্থান ত্বরান্বিত হয়। শিখ হাসিনার শাসনামলে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড আরোপিত হয়। এই ঘটনার পর ২০১৩ সাল থেকে জামায়াতকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
জুলাই ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে শিখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের বহু নেতা ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়েছেন। এই পরিস্থিতি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন বাড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, শিখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন দিল্লি সরকার বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক গঠনের সঙ্গে সংলাপ বাড়াতে চায় এবং সম্ভাব্য দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী। জামায়াতের আমিরের বায়াপাস অস্ত্রোপচারের পরই ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হয়, যা দুই দেশের রাজনৈতিক সমন্বয়ের একটি সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সাক্ষাৎ এবং পরবর্তী আলোচনাগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শাসন কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে জামায়াতের গোপন সাক্ষাৎ নির্বাচনী কৌশল, জোট গঠন এবং ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষই দেশের স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি বিরোধী নীতি এবং সমন্বিত শাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই আলোচনার ফলাফল কীভাবে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



