বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) সম্প্রতি ৭০০ MHz ব্যান্ডের নিলামের নিয়মাবলী সংশোধন করেছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, একক মোবাইল অপারেটর নিলামে মোট স্পেকট্রামের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পেতে পারে। নিলামটি ১৪ জানুয়ারি নির্ধারিত এবং এই পরিবর্তন বাজারের গঠন ও বিনিয়োগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যদি নিলামে শুধুমাত্র একটিই আবেদনকারী থাকে, তবে সে সর্বোচ্চ ১৫ MHz পর্যন্ত অধিগ্রহণের অনুমতি পাবে, যদিও মোট ২৫ MHz স্পেকট্রাম উপলব্ধ। এই সীমা পূর্বের নিয়মের তুলনায় বেশি, যা একক খেলোয়াড়কে বৃহত্তর সিগন্যাল কভারেজ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
বর্তমানে দেশের শীর্ষ দুই মোবাইল সেবা প্রদানকারী—গ্রামীণফোন এবং রবি অক্ষয়—নিলামে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। রবি অক্ষয় এক মাসের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে, যেখানে তৃতীয় বৃহত্তম অপারেটর বাংলালিংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক্লে এখনো কোনো আবেদনপত্র দাখিল করেনি।
গ্রামীণফোনের কর্পোরেট বিষয়ক প্রধান তানভীর মোহাম্মদ জানান, কোম্পানি সব প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছে এবং এখন বিটিআরসি থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, গ্রামীণফোন নিলামের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
স্পেকট্রাম বলতে টেলিকমিউনিকেশন সেবা প্রদানকারী যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে কল, ডেটা ও অন্যান্য সেবা প্রেরণ করে, তা বোঝায়। ৭০০ MHz ব্যান্ডকে ‘গোল্ডেন স্পেকট্রাম’ বলা হয়, কারণ এটি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি হওয়ায় বিস্তৃত কভারেজ, শক্তিশালী ইনডোর পেনিট্রেশন এবং উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তুলনায় কম নেটওয়ার্ক স্থাপন খরচ প্রদান করে। ফলে গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকায় ৪জি এবং ভবিষ্যৎ ৫জি সেবার গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব।
রবি অক্ষয় নিলাম প্রক্রিয়া সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, উল্লেখ করে যে বর্তমান কাঠামো বাজারের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না এবং সকল খেলোয়াড়ের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে না। বিশেষ করে, তারা বলেছে যে নিলামের শর্তাবলী প্রতিযোগিতা ও গ্রাহকের সাশ্রয়ী মূল্যের দিক থেকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করেছে।
রবির কর্পোরেট ও রেগুলেটরি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, নিলামের মূল সমস্যাগুলো হল বাজারে প্রতিযোগিতার হ্রাস এবং শেষ ব্যবহারকারীর জন্য উচ্চ মূল্যের সম্ভাবনা। এই উদ্বেগের ভিত্তিতে তারা নিলামের মূল্য নির্ধারণ ও অংশগ্রহণের শর্তে পুনর্বিবেচনা দাবি করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, একক অপারেটরকে স্পেকট্রামের বড় অংশ প্রদান করলে বাজারে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সেবা মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, উচ্চ মানের ব্যান্ডের সঠিক মূল্যায়ন না হলে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যেতে পারে, ফলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।
ছোট ও মাঝারি অপারেটরদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হলে তারা গ্রাহক ভিত্তি বিস্তারে পিছিয়ে পড়তে পারে, যা বাজারের বৈচিত্র্য হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে, যদি বিটিআরসি নিলামের মূল্য নির্ধারণে যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতি গ্রহণ করে, তবে ৭০০ MHz ব্যান্ডের উচ্চ মানের কারণে সব অপারেটরই নতুন সেবা ও কভারেজ বাড়াতে উৎসাহিত হবে।
বিটিআরসি রোবির এক মাসের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ অনুমোদন করবে কিনা, এবং শেষ পর্যন্ত স্পেকট্রাম কীভাবে বণ্টন হবে, তা দেশের টেলিকমিউনিকেশন খাতের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিলামের ফলাফল ৪জি ও ৫জি নেটওয়ার্কের বিস্তারে গতি যোগাবে, পাশাপাশি গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের সেবা নিশ্চিত করার ভিত্তি গড়ে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, বিটিআরসির নতুন নিলাম নীতি একক অপারেটরের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তবে একই সঙ্গে বাজারের প্রতিযোগিতা ও গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। নিলামের চূড়ান্ত ফলাফল টেলিকম শিল্পের বিনিয়োগ প্রবণতা, সেবা গুণমান এবং মূল্য কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



