চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ৩১ ডিসেম্বর ইংরেজি নববর্ষের উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে এক বক্তৃতা দেন, যেখানে তিনি তাইওয়ান ও চীনের পুনঃএকত্রীকরণকে অপ্রতিরোধ্য বলে উল্লেখ করেন। শি এই মন্তব্য দুই দিনব্যাপী সামরিক মহড়ার শেষের দিনেই করেন, যা বেইজিং-তে ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়। এই মহড়া তাইওয়ানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে তা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বেইজিং-তে দুই দিনব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হয় সোমবার, যেখানে চীনের বিভিন্ন শাখার সেনা ও বায়ু বাহিনীর ইউনিট অংশগ্রহণ করে। মহড়া শেষ হওয়ার ঠিক আগে শি জিনপিং তার ভাষণে জোর দিয়ে বলেন যে, চীন ও তাইওয়ানের জনগণের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধন রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত পুনঃএকত্রীকরণের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি এই বিষয়টি ইতিহাসের সঠিক পথে চীনকে অবস্থান করানোর অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
শি জিনপিং একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বকে পরিবর্তন ও অস্থিরতার সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেখানে কিছু অঞ্চলে এখনও যুদ্ধের ঝড় বয়ে চলছে। তিনি যুক্তি দেন যে, চীন সবসময় ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে এবং তাইওয়ান সংক্রান্ত তার অবস্থানও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। এই মন্তব্যের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানকে ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া অন্তর্ভুক্ত, যা চীনের নিরাপত্তা নীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তের পরপরই চীন ও তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক মহড়া চালু হয়, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে চীন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে এবং তাইওয়ানকে ‘বিচ্ছিন্ন প্রদেশ’ হিসেবে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। শি জিনপিংয়ের মতে, তাইওয়ানকে পুনঃএকত্রীকরণ করা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা চীনের সার্বভৌমত্বের স্বাভাবিক অংশ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাপানও তাইওয়ান ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার এই মন্তব্য জাপান ও চীনের মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান বিরোধকে তীব্রতর করেছে, যা এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে নতুন ধরনের বৈরিতা গড়ে তুলতে পারে।
শি জিনপিংয়ের সতর্কতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-জাপান থেকে আসা সামরিক সমর্থন একসঙ্গে তাইওয়ান সমস্যাকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, যদি চীন তার পুনঃএকত্রীকরণ নীতি অব্যাহত রাখে, তবে ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা চীনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিমুখী। কিছু দেশ চীনের ঐতিহাসিক দাবি স্বীকার করে, তবে অন্যরা তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা রক্ষার পক্ষে সুর তুলে। ভবিষ্যতে কোনো সরাসরি সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শি জিনপিংয়ের পুনঃএকত্রীকরণে অপ্রতিরোধ্যতা জোর দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-জাপান থেকে আসা সামরিক সমর্থন একসঙ্গে তাইওয়ান সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে, যা এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর পুনঃমূল্যায়নকে বাধ্য করবে।
অবশেষে, শি জিনপিংয়ের ভাষণ ও সামরিক মহড়া চীনের তাইওয়ান নীতি পুনরায় দৃঢ় করার সংকেত দেয়, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সামরিক সহায়তা তাইওয়ানকে রক্ষা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই দ্বিপাক্ষিক গতিবিধি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির পুনর্গঠন, কূটনৈতিক আলোচনার তীব্রতা এবং সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



