মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার কংগ্রেসে পাস হওয়া দুইটি আইনকে ভেটো দিয়ে বাতিল করেন, যা তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবারের মতো ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। হোয়াইট হাউসের জানানো মতে, একদিকে কলোরাডোর ইস্টার্ন প্লেইন্সে পরিষ্কার পানির সরবরাহের জন্য প্রস্তাবিত “ফিনিশ দ্য আরকানসাস ভ্যালি কন্ডুইট অ্যাক্ট” এবং অন্যদিকে ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কের ওসিওলা ক্যাম্পে মিকোসুকি আমেরিকান উপজাতির নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর “মিকোসুকি রিজার্ভড এরিয়া অ্যামেন্ডমেন্টস অ্যাক্ট” উভয়ই ভেটো করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পেছনে ব্যয়বহুল প্রকল্পের বিরোধিতা এবং বিশেষ স্বার্থের গোষ্ঠীর জন্য সরকারি তহবিল ব্যয় না করার ইচ্ছা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমে বাতিল হওয়া বিলটি কলোরাডোর ইস্টার্ন প্লেইন্সে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন হিসেবে পরিকল্পিত একটি পানি সরবরাহ পাইপলাইন প্রকল্পকে অনুমোদন করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, যা বহু বছর ধরে স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের দাবি ছিল। তবে হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যামূলক চিঠিতে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, প্রকল্পের মোট ব্যয় অত্যধিক এবং তিনি আমেরিকান করদাতাদেরকে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রতিষ্ঠিত নীতির বোঝা থেকে রক্ষা করতে চান।
পাইপলাইন প্রকল্পের ধারণা প্রথমবারের মতো ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির শাসনামলে উত্থাপিত হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রশাসন এই পরিকল্পনাকে পুনরায় বিবেচনা করেছে, তবে খরচ ও পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে তা কখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। ট্রাম্পের ভেটো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান আর্থিক প্রস্তাবনা ট্যাক্সদাতাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বোঝা সৃষ্টি করবে এবং তাই তিনি এই বিলকে প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন।
বিলটি কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সর্বসম্মত সমর্থন পেয়েছিল। কলোরাডোর দুইজন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর, পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রতিনিধি লরেন বোবের্ট এবং জেফ হার্ডও বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এই বিস্তৃত সমর্থন সত্ত্বেও ট্রাম্পের ভেটো বিলটিকে বাধাগ্রস্ত করে, যা কংগ্রেসকে পুনরায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করা পর্যন্ত অগ্রসর হতে বাধা দেয়।
ভেটোর পর লরেন বোবের্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, “এটা এখানেই শেষ নয়,” ইঙ্গিত দিয়ে যে তিনি এবং তার সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন। এই প্রতিক্রিয়া কংগ্রেসের মধ্যে ভেটো নিয়ে বিতর্ককে তীব্র করে তুলেছে এবং ভবিষ্যতে বিল পাসের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত কৌশলগত সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় ভেটো করা বিলটি মিকোসুকি আমেরিকান উপজাতির এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কের ওসিওলা ক্যাম্পে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গঠিত। এই এলাকাটি সম্প্রতি একটি অভিবাসন আটক কেন্দ্রের অধীনে ছিল, যা “অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ” নামে পরিচিত। মিকোসুকি গোত্রের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং একটি ফেডারেল বিচারক কেন্দ্রের বড় অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন, ফলে কেন্দ্র কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রাম্পের ভেটো চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ওসিওলা ক্যাম্পে মিকোসুকি গোত্রের বসবাসের অনুমতি নেই এবং তার প্রশাসন করদাতাদের অর্থ এমন প্রকল্পে ব্যয় করবে না যা তার অভিবাসন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বিশেষ স্বার্থের গোষ্ঠীর জন্য সরকারি তহবিল ব্যয় না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন, যা তার পূর্ববর্তী অভিবাসন নীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সংবিধান অনুসারে, প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে হলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয়কেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়। এই উচ্চ থ্রেশহোল্ড ভেটোকে রিভার্ট করা কঠিন করে তুলেছে এবং কংগ্রেসকে ভেটো প্রয়োগের পর পুনরায় আলোচনার জন্য যথেষ্ট সমর্থন গড়ে তুলতে বাধ্য করে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি মোট দশটি বিলকে ভেটো দিয়েছিলেন, তবে দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত এই দুইটি বিলই তার একমাত্র ভেটো হিসেবে রেকর্ডে রয়েছে। তার ভেটো ব্যবহারের হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবারের মতো ভেটো প্রয়োগ করা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তার আইনসভার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
এই ভেটোগুলো কংগ্রেসের আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশেষ করে জল সরবরাহ ও আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে ভবিষ্যতে আরও কঠোর আর্থিক পর্যালোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি, ভেটো অগ্রাহ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না হলে, উভয় বিলই পুনরায় বিবেচনা ছাড়াই বাতিল হয়ে যাবে, যা সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও গোষ্ঠীর পরিকল্পনা ও বাজেটকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের এই দুইটি ভেটো তার দ্বিতীয় মেয়াদে আইনসভার সঙ্গে তার অবস্থানকে স্পষ্ট করে এবং কংগ্রেসকে তার নীতি-নির্ধারণে আরও সতর্ক হতে বাধ্য করে। ভেটো প্রক্রিয়ার কঠোরতা এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



