প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র কিরিবাতি ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নতুন বছর উদযাপন করেছে। কিরিবাতির কিরিতিমাতি (Christmas Island) অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক সময়রেখায় সবচেয়ে আগে সূর্যোদয় পায়, ফলে দেশটি হাওয়াইয়ের এক দিন আগে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ষোল হাজার, এবং সময় পার্থক্যের কারণে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টিতে প্রথম সূর্যোদয়ের সাক্ষী হয়ে ওঠে।
কিরিবাতি প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যা হাওয়াইয়ের দক্ষিণে এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। দেশটির ভূখণ্ড পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত, যেখানে অসংখ্য প্রবাল প্রাচীরের সমষ্টি রয়েছে। এই প্রবাল প্রাচীরগুলোর বেশিরভাগই এখনো মানব বসতির বাইরে, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নিম্নভূমি এলাকাগুলো বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কিরিবাতির স্বাধীনতা ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্য থেকে অর্জিত হয় এবং তখন থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত বৃহৎ সামুদ্রিক রিজার্ভের মাধ্যমে দেশটি সমুদ্র সংরক্ষণ ও টেকসই মাছধরা নীতিতে অগ্রণী। এই রিজার্ভটি আঞ্চলিক জৈববৈচিত্র্যের রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমর্থন পায়।
কিরিবাতির কিরিতিমাতি দ্বীপটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্যালেন্ডার দ্বীপ হিসেবে পরিচিত, যেখানে সূর্যোদয় প্রথমে দেখা যায়। এই অনন্য সময়গত সুবিধা দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও মিডিয়া দৃষ্টিতে আলাদা করে তুলেছে। তবে একই সঙ্গে, দ্বীপের নিম্নভূমি অংশগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে প্লাবনের ঝুঁকিতে, যা স্থানীয় সরকারকে অবিলম্বে অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণে বাধ্য করেছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে কিরিবাতি অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি ও প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। “প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দেশগুলোকে বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিতে শোনা দরকার,” একটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, যা কিরিবাতির কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিরিবাতির সময়সূচি তুলনা করা যায় টোঙ্গার সঙ্গে, যা পূর্বে বছরের প্রথম দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে কিরিবাতি এখন এই শিরোপা ধরে রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক সময়রেখার সূক্ষ্ম পার্থক্যকে তুলে ধরে। এই পার্থক্যটি কেবল সাংস্কৃতিক দিকেই নয়, কূটনৈতিক আলোচনায়ও প্রভাব ফেলে, কারণ দেশটি সময়ের আগে নতুন বছরের সূচনা করে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
ভবিষ্যতে কিরিবাতি ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া পারিস ক্লাইমেট সম্মেলনে প্রধান ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। দেশটি সমুদ্র স্তর বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় নতুন অভিযোজন কৌশল উপস্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, স্থানীয় সরকার প্রবাল প্রাচীর পুনরুদ্ধার ও সমুদ্রসীমা রক্ষা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিরিবাতির এই প্রথম উদযাপন কেবল সময়ের দিক থেকে নয়, বরং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের দৃঢ়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক। সময়ের আগে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে দেশটি বিশ্বকে তার সংকল্প ও কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে মনোযোগী করেছে, যা ভবিষ্যতে সমুদ্র স্তর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



