ইসরায়েলি সরকার গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে কাজ করা ত্রিশ‑সাতটি মানবিক সংস্থার লাইসেন্স রদ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। নতুন নিবন্ধন নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থতা এবং কর্মীদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য না জমা দেওয়াকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ৬০ দিনের মধ্যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
লাইসেন্স বাতিলের তালিকায় অ্যাকশন এইড, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি এবং নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থা অন্তর্ভুক্ত। ইসরায়েলি প্রবাস বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ত্রাণ সংস্থাগুলো যদি কর্মীদের সঠিক ও যাচাইযোগ্য তথ্য না দেয়, তবে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই মানবিক কাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, লাইসেন্স বাতিলের ফলে গাজায় মানবিক সহায়তা সরবরাহে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। জাতিসংঘ, দ্বিপক্ষীয় অংশীদার এবং অনুমোদিত অন্যান্য মানবিক সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ কাজ চালিয়ে যাবে বলে তারা আশ্বাস দিয়েছে। তবে এই আশ্বাসের পরেও, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গাজায় জরুরি সেবা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জাপানসহ দশটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যৌথ বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেছে, ত্রাণ সংস্থার কার্যক্রম জোরপূর্বক বন্ধ করা গাজার মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং জরুরি চিকিৎসা, খাবার ও শরণার্থী সহায়তার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তারা ইসরায়েলকে ত্রাণ সংস্থার কাজ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, নতুন নীতিমালা নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়। তারা যুক্তি দেন, ত্রাণ সংস্থার কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য না থাকলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত সংযোগের ঝুঁকি থাকে, যা মানবিক মিশনের সাফল্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এই শর্ত পূরণ না করলে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পর, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে। কিছু সংস্থা ইতিমধ্যে গাজায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে অনুমোদন চেয়েছে, অন্যরা দ্বিপক্ষীয় চ্যানেল ব্যবহার করে সরবরাহের পথ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। তদুপরি, কিছু সংস্থা তাদের কর্মীদের তথ্য আপডেট করার জন্য অতিরিক্ত সময়ের অনুরোধ করেছে, তবে ইসরায়েলি মন্ত্রণালয় এখনও স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেনি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই পদক্ষেপটি গাজার মানবিক সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে নতুন জটিলতা যোগ করতে পারে। পূর্বে ইসরায়েলও অনুরূপ নীতি প্রয়োগ করে কিছু সংস্থার কাজ সীমিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে, ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের উপর চাপ বাড়লে গাজার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সরকার দাবি করে যে, অনুমোদিত সংস্থাগুলো এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের মাধ্যমে মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তারা উল্লেখ করেছে, এই ব্যবস্থা গাজার জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা সামগ্রী এবং পুনর্নির্মাণ কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে তা এখনও অনিশ্চিত।
এই ঘটনার পর, গাজার মানবিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরে ফিরে এসেছে। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয়কারী অফিস গাজায় ত্রাণের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করে, এবং ইসরায়েলি নীতির প্রভাব মূল্যায়নের জন্য জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দাতা দেশগুলো গাজার জন্য অতিরিক্ত তহবিল ও সরবরাহের ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সিদ্ধান্তটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও মানবিক নীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে তীব্রতর করেছে। ইসরায়েল নিরাপত্তা উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিয়ে মানবিক কার্যক্রমে শর্ত আরোপের প্রবণতা দেখাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তার স্বতন্ত্রতা রক্ষার পক্ষে সুর তুলে। এই দ্বন্দ্বের সমাধান গাজার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে, ইসরায়েলি মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনার ফলাফল গাজার মানবিক পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। যদি সংস্থাগুলো নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে না পারে, তবে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, যদি নতুন নিবন্ধন নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা হয়, তবে ত্রাণ সংস্থাগুলোর কাজ পুনরায় চালু হতে পারে। এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি গাজার জনগণের জীবনের মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীরে ৩৭টি ত্রাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার দাবি ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে সমতা রক্ষা করা এখনই কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয়। গাজার মানবিক সংকটের সমাধানে এই সিদ্ধান্তের পরিণতি কী হবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



