ইরানে মুদ্রা মূল্যহ্রাস ও তীব্র মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তৃতীয় ধারাবাহিক দিন প্রতিবাদ চলছে। দোকানদার, ছাত্র ও সাধারণ নাগরিক রাস্তায় নেমে সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। এই আন্দোলন রিয়ালের ডলারের বিপরীতে রেকর্ড নিম্নগামী মূল্যের পর গ্র্যান্ড বাজারে শুরু হওয়া ধর্মঘটের ধারাবাহিকতা, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে নতুন মোড়ে নিয়ে এসেছে।
রিয়ালের ডলারের তুলনায় রেকর্ড নিম্নমূল্য পৌঁছানোর পর রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের বিক্রেতারা কাজ বন্ধ করে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। এই ধর্মঘট দ্রুতই তেহরানের বাইরে অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে, এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত তৃতীয় দিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে। বাজারে পণ্যের ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির তীব্রতা ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ইরান সরকার এই প্রতিবাদকে স্বীকার করে এবং কঠোর রূপ নিলে শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে নির্দেশ দেন, যাতে তিনি প্রতিবাদকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেন। সরকার এই নির্দেশনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমাতে এবং জনমতকে শান্ত করতে চেষ্টা করছে।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদরেজা ফারজিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে, এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আব্দুলনাসের হেম্মাতিকে নতুন গভার্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। নতুন গভার্নরের দায়িত্বে রয়েছে মুদ্রা স্থিতিশীলতা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ত্বরান্বিত নীতি প্রণয়ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করে, তারা সরকারবিরোধী শ্লোগান উচ্চারণ করে। “একনায়কের মৃত্যু” শ্লোগানটি শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে, যা দেশের শাসন কাঠামোর প্রতি গভীর অসন্তোষের প্রকাশ। শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ প্রতিবাদকে সামাজিক স্তরে বিস্তৃত করেছে এবং সরকারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
কিছু অংশগ্রহণকারী দেশের প্রাক্তন শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নামেও শ্লোগান তুলেছেন, যা অতীতের শাসনব্যবস্থার প্রতি সমালোচনা নির্দেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী রেজা পাহলভি সামাজিক মাধ্যমে লিখে জানান, শাসকরা ক্ষমতায় থাকলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত হবে না এবং তিনি জনগণের সঙ্গে আছেন। তার এই মন্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ অশান্তিকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্সি ভাষার একাউন্টে এই প্রতিবাদকে সমর্থন জানানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতি মনোযোগের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বৈঠক করেন, যেখানে ইরানকে আলোচনার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প শাসন পরিবর্তনের সমর্থন সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে, ইরানের মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দেউলিয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন।
প্রতিবাদ চলমান থাকায় ইরানের নেতৃত্বকে অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুদ্রা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন গভার্নর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভূমিকা এই সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ, এবং যদি অর্থনৈতিক নীতি কার্যকর না হয় তবে আরও বৃহৎ প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন ও চাপের মধ্যে সরকার কীভাবে সাড়া দেবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, মুদ্রা পতন ও মুদ্রাস্ফীতির ফলে ইরানে তীব্র সামাজিক অশান্তি দেখা দিয়েছে, সরকার পদত্যাগ ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সংকট মোকাবেলায় পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে অর্থনৈতিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঠিক পরিচালনা না হলে দেশীয় অশান্তি বাড়তে পারে।



