ইরানের রাজধানী তেহরানে মঙ্গলবার ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ শুরু হয়, যেখানে রিয়ালের ধারাবাহিক পতন ও মন্দা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ নীরব থাকতে পারছে না। এই প্রতিবাদ তেহরানের পাশাপাশি ইসফাহান, ইয়াজদ ও জাঞ্জানের মতো শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
তেহরানে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে গিয়ে মুদ্রা হ্রাস ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে। একই সময়ে ইসফাহান, ইয়াজদ ও জাঞ্জানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা সমানভাবে সড়কে বেরিয়ে আসে, যা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বিস্তৃত অস্থিরতা নির্দেশ করে।
ইরানের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ইলনা সংস্থা জানায়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট দশটি ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ হয়, যার মধ্যে সাতটি তেহরানের ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সংখ্যা পূর্বের দুই দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
প্রতিবাদের তীব্রতা তৃতীয় ধারাবাহিক দিনে পৌঁছায়, যখন তেহরানের জোমহুরি এলাকায় এবং গ্র্যান্ড বাজারের নিকটস্থ দুইটি প্রধান টেক ও মোবাইল ফোন শপিং সেন্টারের দোকানদাররা রবিবার তাদের ব্যবসা বন্ধ করে রিয়ালের রেকর্ড নিম্নমানের প্রতিবাদে অংশ নেয়। তারা উল্লেখ করে, রিয়ালের তীব্র পতনের ফলে আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে এবং স্থানীয় বিক্রেতাদের ক্ষতি হয়েছে।
রিয়ালের মূল্য গত সপ্তাহে দ্রুত হ্রাস পেয়ে এক ডলারকে প্রায় ১.৪২ মিলিয়ন রিয়াল পর্যন্ত পৌঁছে, যা এক বছর আগে ৮২০,০০০ রিয়ালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি। এই মুদ্রা হ্রাসের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আরোপিত নতুন নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের প্রভাব রয়েছে।
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘ দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে; তবে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে জাতিসংঘের পুনরায় আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, যা দশ বছর আগে বাতিল হয়েছিল, দেশের আর্থিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত।
বর্ধিত প্রতিবাদে সরকারী মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি তেহরানের একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার জনগণের উদ্বেগ শোনার জন্য প্রস্তুত এবং তা ধৈর্য্যের সঙ্গে গ্রহণ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদিও প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠস্বর তীব্র হতে পারে, তবু সরকার তাদের কথা শোনার এবং সমস্যার সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা রাখে।
মোহাজেরানি আরও উল্লেখ করেন, “সরকারের কাজ হল জনগণের কণ্ঠ শোনা এবং সমাজে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে একসাথে কাজ করা”। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সমাধানে সরকারকে জনগণের ধৈর্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
এই ঘোষণার পরেও প্রতিবাদকারীরা রিয়ালের অবনতি ও মূল্যস্ফীতি থামাতে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপের দাবি করে তেহরান ও অন্যান্য শহরে রাস্তায় উপস্থিত থাকে। সরকারী দিক থেকে আর্থিক নীতি সংশোধন, মুদ্রা স্থিতিশীলতা ও আমদানি পণ্যের মূল্যের নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণগুলো—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রা অবমূল্যায়ন—দ্রুত সমাধান না করতে পারে, তবে প্রতিবাদ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। তেহরানের শাসনব্যবস্থা এখনো জনমতকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম না হলে, ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সামাজিক আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মুদ্রা ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আলোচনার ফলাফলও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে। যদি নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দিকে যায়, তবে রিয়ালের অবনতি ধীর হতে পারে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
অবশেষে, সরকারী পক্ষের প্রতিশ্রুতি ও প্রতিবাদকারীদের দাবির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা বর্তমান সংকটের সমাধানের মূল চাবিকাঠি হবে। তেহরান ও অন্যান্য শহরে চলমান প্রতিবাদগুলো কীভাবে সমাপ্ত হবে, তা নির্ভর করবে সরকারী নীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং জনগণের ধৈর্যের সমন্বয়শীলতার ওপর।



