জেমস রিওর্ডনের ‘Crush’ বইটি গ্র্যাভিটি কীভাবে পৃথিবীর সব জীবের গঠন ও আচরণকে প্রভাবিত করে তা বিশদভাবে উপস্থাপন করে। MIT Press প্রকাশিত এই কাজটি বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ইতিহাসের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পাঠকদের মৌলিক শক্তির ভূমিকা বুঝতে সাহায্য করে। বইটি প্রকাশের পর বিজ্ঞানপ্রেমী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
১৭শ শতাব্দীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন গ্র্যাভিটিকে স্বীকার করলেও তার প্রকৃত স্বভাব সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট ধারণা রাখতে পারেননি। তিনি কেবলমাত্র গুরুত্বের গাণিতিক সূত্রই প্রকাশ করেন, কিন্তু কেন সবকিছুই তা অনুসরণ করে তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তিনশ বছরেরও বেশি সময় পরও গ্র্যাভিটি এখনও সবচেয়ে পরিচিত ও সবচেয়ে অজানা শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
রিওর্ডন এই দ্বৈততা ব্যবহার করে বইয়ের মূল থিম গড়ে তোলেন। তিনি জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক উদাহরণগুলোকে একত্রে বুনে পাঠকের কাছে জটিল ধারণা সহজে উপস্থাপন করেন। তার লেখনীতে হালকা হাস্যরসের ছোঁয়া রয়েছে, যা জটিল বিষয়গুলোকে বোধগম্য করে তুলতে সহায়তা করে।
দৈনন্দিন জীবনে গ্র্যাভিটি এতটাই অন্তর্ভুক্ত যে আমরা প্রায়ই তা অনুভবই করি না। কেবলমাত্র যখন লিফটের হঠাৎ থামা বা ত্বরান্বিত হওয়া হয়, তখনই এর উপস্থিতি স্পষ্ট হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে গুরুত্ব পৃথিবীর সব জীবের গঠনকে মৌলিকভাবে নির্ধারণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, সাপের হৃদয় গুরুত্বের দিকনির্দেশে নির্দিষ্ট স্থানে থাকে, যা তাদের রক্ত সঞ্চালনকে কার্যকর করে। একইভাবে, গুরুত্বের সীমা নির্ধারণ করে যে কোনো প্রাণী কত বড় হতে পারে; অতিরিক্ত ভর হলে গঠনগত অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।
মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে, অর্থাৎ মহাকাশে শূন্যবজনের অবস্থায়, মানবদেহের ওপর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। মহাকাশচারীরা দীর্ঘ সময় ভাসমান অবস্থায় থাকলে পেট ফাঁপা হয়ে যায়, ইন্দ্রিয়গুলো ধীর হয়ে যায় এবং হাড় ও পেশী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তনগুলো গ্র্যাভিটির অনুপস্থিতিতে শরীরের স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাতের ফল।
পৃথিবীর বাইরেও গ্র্যাভিটি গ্রহের বাসযোগ্যতার মূল শর্ত নির্ধারণ করে। একটি গ্রহের ভর তার বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার ক্ষমতা ও তরল জল বজায় রাখার সম্ভাবনা নির্ধারণ করে। যথেষ্ট গুরুত্ব না থাকলে বায়ু দ্রুত হারিয়ে যায়, ফলে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে ওঠে না।
রিওর্ডন ঐতিহ্যবাহী ‘হ্যাবিটেবল জোন’ ধারণার বাইরে গিয়ে ‘রোগো প্ল্যানেট’—যে গ্রহগুলো কোনো নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরে না—এর সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেন। এসব গ্রহের গুরুত্ব গ্রহের গঠনগত তাপ ও রেডিওঅ্যাক্টিভ ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে ঘন বরফের নিচে আটকে রাখে, ফলে হাজার কোটি বছর ধরে সাবসারফেসে তরল সমুদ্র থাকতে পারে।
ব্রহ্মাণ্ডে রোগো প্ল্যানেটের সংখ্যা তারকাভিত্তিক গ্রহের তুলনায় অনেক বেশি বলে অনুমান করা হয়। তাই রিওর্ডন যুক্তি দেন যে, পরিসংখ্যানগতভাবে এই ধরনের গ্রহগুলো জীবনের সম্ভাব্যতম স্থান হতে পারে। যদিও সূর্যের আলো নেই, তবু গুরুত্বের মাধ্যমে তাপ সংরক্ষণ করে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত বজায় রাখতে পারে।
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। রিওর্ডন জটিল গাণিতিক ধারণাকে সহজ উদাহরণ ও চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকের জন্য বিষয়টি সহজে হজমযোগ্য করে। তার বিশ্লেষণ গ্র্যাভিটিকে শুধুমাত্র একটি শারীরিক শক্তি নয়, জীবনের বিকাশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।
সারসংক্ষেপে, ‘Crush’ গ্র্যাভিটির বহুমুখী প্রভাবকে একত্রে সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। পাঠকরা যদি গ্র্যাভিটির ভূমিকা সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পেতে চান, তবে এই বইটি একটি মূল্যবান রেফারেন্স হতে পারে। আপনার কি মনে হয়, ভবিষ্যতে গ্র্যাভিটির নতুন কোনো দিক আবিষ্কারের সম্ভাবনা কতটা?



