বিবিসির অভিজ্ঞ সামরিক প্রতিবেদক জন সিম্পসন ২০২৫ সালে বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি অতীতের কোনো বছরের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সংঘাতের সরাসরি সাক্ষী এবং এই বছরের ঘটনাগুলোকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে আলাদা অবস্থানে রাখছেন।
সিম্পসন ১৯৬০-এর দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেন, শীতল যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এবং পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তার ক্যারিয়ারে সিয়েরিয়া, ফালিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান সহ বহু যুদ্ধের মাঠে উপস্থিতি রয়েছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে বর্তমান বছরের বিশাল ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
২০২৫ সালে একাধিক বড় সংঘাত একসাথে জোরালোভাবে বিশ্বকে প্রভাবিত করছে, তাই এটি ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান পেয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজা অঞ্চলের পুনরায় উত্তেজনা এবং সুদানের গৃহযুদ্ধ একসাথে মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। এসবের সমন্বয়ই সিম্পসনকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি ইতিমধ্যে এই যুদ্ধকে বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর সংঘাতে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি রাশিয়ার আক্রমণাত্মক নীতি এবং তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাব্য বিস্তারকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। সিম্পসনও একই দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে, বলেন যে এই আশঙ্কা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা যায় না।
নাটো সদস্য দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক, বিশেষ করে সমুদ্রতলের কেবল কেটে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে রুশ ড্রোনের নজরদারি এবং সাইবার আক্রমণের হুমকি নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রযুক্তিগত হুমকিগুলো যুদ্ধের প্রচলিত সীমা ছাড়িয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার বিদেশে বিরোধী মতামতধারীদের লক্ষ্য করে হত্যাচেষ্টা চালানোর অভিযোগ তুলেছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের সলসবেরিতে সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপালের ওপর বিষপ্রয়োগের তদন্তে দেখা যায়, এই কাজের অনুমোদন রাশিয়ার শীর্ষ স্তর থেকে এসেছে, যা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অনুমোদন নির্দেশ করে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে কেবলমাত্র বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ১৪,০০০-এ পৌঁছেছে। এই সংখ্যা যুদ্ধের তীব্রতা এবং মানবিক সংকটের মাত্রা তুলে ধরে, যদিও সামরিক ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।
গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালু হওয়া সামরিক অভিযান এখন পর্যন্ত ৭০,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মৃতের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা ৩০,০০০ অতিক্রম করেছে, যা মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
সুদানের দুই সামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ গত দুই বছরে প্রায় ১.৫ লক্ষ মানুষকে প্রাণহানি করেছে এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষকে ঘরবিহীন করে তুলেছে। এই বিশাল শরণার্থী সংখ্যা অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করার পরেও স্থায়ী শান্তি চুক্তি গড়ে তোলার পথে অগ্রগতি সীমিত রয়ে গেছে। সিম্পসন উল্লেখ করেন, যদিও সাময়িক শর্তে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছে, তবে মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়ায় সংঘাতের পুনরাবৃত্তি সম্ভব।
সিম্পসন জোর দিয়ে বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধের গুরুত্ব অন্যান্য সংঘাতের তুলনায় বেশি, কারণ এটি সরাসরি বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ইউক্রেনের ফলাফল নির্ভর করবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং বৃহত্তর জিওপলিটিক্যাল মডেলের ভবিষ্যৎ গঠনে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে ন্যাটোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, রাশিয়ার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা উল্লেখ করছেন। একই সঙ্গে সুদানের মানবিক সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপ এবং গাজা-ইসরায়েল সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতার জন্য বহু পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে। এই সব বিষয়ই ২০২৫ সালের পরবর্তী মাসে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতির মূল দিক নির্ধারণ করবে।



