গুলশানের বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে ৩০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এক সমাবেশে ফরহাদ মজহার খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিশদ মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান তার দৃঢ়তা ও আপসহীনতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই বক্তব্যের পেছনে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জিয়ার ব্যক্তিগত সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন।
মজহারের কথা বলার আগে তিনি কার্যালয়ে সংরক্ষিত শোকবইতে স্বাক্ষর করেন, যা পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার প্রতি সম্মানসূচক পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়। শোকবইতে স্বাক্ষর করার পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ শুরু করেন, যেখানে তিনি জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু মূল দিক বিশ্লেষণ করেন।
মজহার জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়ার ওপর যে নিপীড়ন চালিয়ে আসা হয়েছে, তা তাকে আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থানে রাখতে বাধ্য করেছে। তিনি যুক্তি দেন, যদি জিয়া ঐ সময়ে এই দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারতেন না, তবে জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান সম্ভব হতো না। এই মন্তব্যে তিনি জিয়ার ব্যক্তিগত সহনশীলতাকে মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলগুলো এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দাবি করে আসলেও, মজহার বলেন নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত জনগণই প্রদান করে। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও পরে বহু ব্যক্তি নেতৃত্বের দাবি করেছেন, তবে প্রকৃত নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল জনগণের সমর্থন ও জিয়ার নীরব সংগ্রাম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জনগণের ভূমিকা ও জিয়ার অবদানকে সমানভাবে গুরুত্ব দেন।
মজহার আরও বলেন, খালেদা জিয়ার নীরব কিন্তু দৃঢ় লড়াইই এই আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জিয়ার এই ধরনের সংগ্রামকে স্বীকৃতি না দিলে ইতিহাসের সত্যিকারের চিত্র অর্ধেকই রয়ে যাবে। তার মতে, জিয়ার নীরব সংগ্রামের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তার ভূমিকা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে মজহারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তিনি বলেন, এখন কোন পথে অগ্রসর হওয়া হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র দলীয় আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের ইচ্ছা ও প্রত্যাশাকে মাথায় রেখে গৃহীত হওয়া উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে তাদের চাহিদা শোনার সুযোগ পাবে।
বিএনপির ওপর এখনো বড় দায়িত্ব রয়েছে, মজহার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান—বিশেষ করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক—এই বিষয়গুলোতে দলকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। মজহার আশা প্রকাশ করেন, দলীয় নেতৃত্ব এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে।
মজহার জোর দিয়ে বলেন, খালেদা জিয়া শুধুমাত্র দলের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত নিতেন না, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত গ্রহণ করতেন। তিনি এই ধরনের পরামর্শমূলক নেতৃত্বকে প্রশংসা করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, ভবিষ্যতে এমন সমন্বিত ও পরামর্শমূলক নেতৃত্ব আবার দেখা যাবে কিনা। এই মন্তব্যে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ গঠন ও নেতৃত্বের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সারসংক্ষেপে, ফরহাদ মজহার গুলশানের এই সমাবেশে খালেদা জিয়ার আপসহীনতা ও নীরব সংগ্রামকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, জনগণের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপির দায়িত্বকে পুনরায় জোর দেন। এই মন্তব্যগুলো বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করতে পারে।



