ইরানের রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য শহরে মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন ও মৌলিক পণ্যের দামের দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে। তৃতীয় দিন ধারাবাহিকভাবে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার বন্ধ রাখা হয়েছে, যেখানে বিক্রেতারা দোকান না খুলে প্রতিবাদকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন। একই সময়ে কেরমানশাহসহ বেশ কয়েকটি শহরে প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী ভিড় পাহলভি শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দাবি করে স্লোগান তুলেছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের শাসনব্যবস্থা ছিল।
প্রতিবাদকারীরা মুদ্রা মানের অস্বাভাবিক পতন ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসের দামের উত্থানকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীরা শূন্য তাক রেখে, বিক্রয় বন্ধ করে, ভিড়ের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে তাদের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ দিয়েছেন। কেরমানশাহে প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় মঞ্চ স্থাপন করে, মাইক্রোফোনে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে, পুরনো শাসনব্যবস্থার স্মৃতি তোলার চেষ্টা করেছে।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নাগরিকদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেহরান প্রদেশের প্রশাসন সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করেছে। লকডাউনের আওতায় শহরের প্রধান সড়কগুলো বন্ধ, পাবলিক পরিবহন স্থগিত, এবং অপ্রয়োজনীয় চলাচল সীমিত করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী গার্ড ও সশস্ত্র পুলিশ অন্তর্ভুক্ত, প্রতিবাদ দমন ও জনশান্তি বজায় রাখতে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আঘাতপ্রাপ্তের সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের নিরাপত্তা সংস্থা ও সরকারী মুখপাত্ররা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে, প্রতিবাদকারীদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, মুদ্রা পতন ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার জন্য অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করা হবে, তবে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যভাবে ইরানের প্রতিবাদকারীদের সমর্থন জানিয়েছে। সংস্থা সোমবার একটি পোস্টে ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য তাদের পাশে থাকবে বলে উল্লেখ করেছে। এই সমর্থন ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জটিলতা যোগ করেছে, কারণ ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা রয়েছে।
মোসাদের এই ঘোষণা ইরানের সরকারকে অতিরিক্ত চাপের মুখে ফেলতে পারে, কারণ এটি দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তেহরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে মোসাদের প্রকাশ্য সমর্থনের প্রতি সতর্কতা প্রকাশ করে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের মধ্যে কিছু দলীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে, যদিও তারা সরাসরি নাম উল্লেখ না করেও সমাবেশে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তাদের দাবি মূলত অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন, মুদ্রা স্থিতিশীলতা এবং মৌলিক পণ্যের সুলভ মূল্যের দিকে কেন্দ্রীভূত।
ইরানের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মুদ্রা পতনের পেছনে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, স্যান্কশন এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা উল্লেখ করে, দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তারা সতর্ক করেছেন, যদি দামের বৃদ্ধি ও মুদ্রা অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে সামাজিক অশান্তি আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবাদে ব্যবহৃত স্লোগান ও চিত্রকল্পে ইরানের অতীত শাসনব্যবস্থার প্রতি নস্টালজিয়া স্পষ্ট, যা কিছু বিশ্লেষকের মতে দেশের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে টানাপোড়েনের প্রতিফলন। তবে সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের রেট্রো-স্লোগানকে জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অবস্থা নিয়ন্ত্রণে তেহরান প্রদেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আগামী কয়েক দিন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে, প্রতিবাদকারীদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংলাপের দরজা খুলে রাখার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে, অর্থনৈতিক নীতি সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে, মুদ্রা ও মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে পারে, যা সরকারী কাঠামোকে পুনর্গঠন বা সংস্কারের দিকে ধাবিত করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মোসাদের সমর্থন একসাথে বিবেচনা করে, অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি মুদ্রা অবমূল্যায়ন, মূল্যবৃদ্ধি এবং সামাজিক অসন্তোষের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সমর্থন উভয়ই দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিককে প্রভাবিত করবে।



