বোরজা, স্পেনের এক ছোট গ্রাম থেকে সম্প্রতি ৯৪ বছর বয়সে প্রস্থান করা সিসিলিয়া গিমেনেজ, তার অপ্রত্যাশিত শিল্পকর্মের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে তিনি স্থানীয় গির্জার শতবর্ষ পুরনো “ইক্কে হোমো” ফ্রেসকোটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেন, যা ফলস্বরূপ একটি বিশাল বিতর্কের জন্ম দেয়। গিমেনেজের মৃত্যু গ্রামবাসী ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের মধ্যে শোকের স্রোত তৈরি করেছে, কারণ তিনি অজান্তেই একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা তৈরি করেছিলেন।
“ইক্কে হোমো” মূলত যীশু খ্রিস্টের মুখমণ্ডলকে চিত্রিত একটি ফ্রেসকো, যা ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে গির্জার দেয়ালে অঙ্কিত হয়। গির্জা দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থায় ছিল, ফলে স্থানীয় প্যারিশনদের মধ্যে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন অনুভূত হয়। গিমেনেজ, যিনি ছোটবেলা থেকেই চিত্রাঙ্কনে আগ্রহী ছিলেন, নিজে থেকেই কাজটি গ্রহণ করেন এবং গির্জার অনুমতি পেয়ে রঙের ক্যানভাস ও তেল ব্যবহার করে পুনরায় রঙ করার উদ্যোগ নেন।
গিমেনেজের পুনরুদ্ধার কাজটি শুরু হয় ২০১২ সালের গ্রীষ্মে, যখন তিনি গির্জার দেয়ালে থাকা পুরনো রঙের স্তরগুলোকে সরিয়ে নতুন রঙের স্তর প্রয়োগ করেন। তবে তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে কাজটি দ্রুতই ব্যর্থ হয়। রঙের রঙিনতা ও অনুপাতের বিচ্যুতি দেখা যায়, ফলে যীশুর মুখমণ্ডলটি অস্বাভাবিকভাবে বিকৃত হয়ে যায়। গির্জার পাস্টর ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অবগতির পরই কাজটি থামানো হয়, তবে ইতিমধ্যে ছবিটি অনলাইন জগতে ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা গিমেনেজের কাজকে “মাঙ্কি ক্রাইস্ট” (বানর খ্রিস্ট) নামে উপহাসের সঙ্গে গ্রহণ করে। ছবির বিকৃত মুখমণ্ডলটি দ্রুতই মিমে রূপান্তরিত হয় এবং বিশ্বব্যাপী সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বহু সংবাদ সংস্থা ও ব্লগার এই ঘটনাকে কৌতুকের বিষয়বস্তু করে তুলে ধরেন, তবে একই সঙ্গে গিমেনেজের অনিচ্ছাকৃত সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে ছোট গ্রামটি পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্রমণকারীরা এখন ঐ বিকৃত ফ্রেসকোটি দেখার জন্য দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে আসেন।
গিমেনেজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানা যায় যে তিনি বোরজার এক সাধারণ পারিবারিক পটভূমি থেকে এসেছেন এবং ছোটবেলা থেকেই চিত্রাঙ্কনের প্রতি গভীর আকর্ষণ পোষণ করতেন। তিনি স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন, তবে পেশাগতভাবে কোনো শিল্পী হিসেবে কাজ করেননি। তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা তাকে “চিত্রের প্রেমিক” হিসেবে বর্ণনা করেন, কারণ তিনি ঘরে ঘরে পুরনো চিত্রকর্মের রক্ষণাবেক্ষণ ও রঙের কাজ করতেন। তার এই শখই শেষ পর্যন্ত তাকে ঐ ঐতিহাসিক ফ্রেসকোটি পুনরুদ্ধার করার পথে নিয়ে যায়।
গিমেনেজের মৃত্যু সম্পর্কে বোরজার মেয়র এডুয়ার্ডো আরিলা ফেসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেন যে তিনি ৯৪ বছর বয়সে আর না থাকবেন। মেয়র তার পোস্টে গিমেনেজের চিত্রকলার প্রতি প্রাথমিক ভালোবাসা ও স্থানীয় সংস্কৃতিতে তার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি গিমেনেজের “ইক্কে হোমো” পুনরুদ্ধারকে একটি “বিশেষ ঘটনা” হিসেবে স্মরণ করেন, যা গির্জার সংরক্ষণ সমস্যাকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে তুলে ধরেছে। আরিলার মন্তব্যে গিমেনেজের মানবিক দিক ও তার সরলতা প্রশংসা করা হয়েছে।
গিমেনেজের কাজের ফলে বোরজা গ্রামটি অপ্রত্যাশিত পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারী ও ফটোগ্রাফাররা এখন গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ বিকৃত ফ্রেসকোটি ক্যামেরায় ধারণ করতে আসেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই নতুন পর্যটক প্রবাহকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন স্মারক সামগ্রী ও গাইডবুক তৈরি করে বিক্রি শুরু করেছে। যদিও ফ্রেসকোর মূল শিল্পমূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবু এটি গ্রামটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি অপ্রত্যাশিত চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গিমেনেজের মৃত্যুর পর স্থানীয় সমাজে তার প্রতি সম্মান ও সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে। অনেকেই তাকে শুধু একটি ভুলের উদাহরণ হিসেবে নয়, বরং সৃজনশীলতা ও মানবিক ত্রুটির মিশ্রণ হিসেবে স্মরণ করেন। তার গল্পটি এখনো সামাজিক মাধ্যমে পুনরায় আলোচিত হয়, যেখানে মানুষ তার সাহসিকতা ও অনিচ্ছাকৃত সাফল্যকে প্রশংসা করে। গিমেনেজের জীবন ও কাজের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত ভুলই ইতিহাসের পাতায় একটি নতুন অধ্যায় যোগ করে।
সিসিলিয়া গিমেনেজের মৃত্যু বোরজা গ্রামকে এক অনন্য স্মৃতি দিয়ে বিদায় জানায়। তিনি আর না থাকলেও তার নাম ও কাজের প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে রয়ে যাবে। তার জীবনকথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিল্পের পথে ভুল করা মানেই শেষ নয়; বরং তা নতুন দৃষ্টিকোণ ও আলোচনার জন্ম দিতে পারে।



