মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষণকারী সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR) সম্প্রতি প্রকাশিত “কনফ্লিক্টস টু ওয়াচ ইন ২০২৬” রিপোর্টে জানিয়েছে যে, কাশ্মীরের ওপর চলমান বিরোধের কারণে ২০২৬ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পুনরায় সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে। দুই পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হওয়ায় এই সম্ভাবনা মাঝারি স্তরে মূল্যায়িত হয়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাশ্মীরের সন্ত্রাসী হামলা উভয় দেশের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে সীমান্তে পুনরায় উত্তেজনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে, যদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কোনো বড় আকারের আক্রমণ চালায়, তবে তা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ধাবিত হতে পারে।
এই পূর্বাভাসের পটভূমিতে রয়েছে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে পেহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা, যেখানে ২৬ জন নিহত হয়। এই ঘটনার পর ভারত সরকার পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করে “অপারেশন সিঁদুর” নামে একটি সামরিক অভিযান চালায়।
অপারেশন সিঁদুরের সূচনায় ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের নির্দিষ্ট এলাকায় আক্রমণ চালায় এবং পাকিস্তানকে সশস্ত্র হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে। পাকিস্তান দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সীমান্তে চার দিনব্যাপী গুলিবর্ষণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার করে। এই ধারাবাহিকতা দুই দেশের মধ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
চতুর্থ দিন পর, ১০ মে ২০২৩ তারিখে উভয় পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। এই বিরতির সময় উভয় সরকার সীমান্তে অস্ত্রবিরতি বজায় রাখে এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুসারে, তার ব্যক্তিগত মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে এই যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই দাবির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবু এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তুলে ধরতে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
CFR-এর বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের সম্ভাব্য সংঘর্ষের পূর্বে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি মূল কারণ হতে পারে। তারা পরামর্শ দেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাস করা জরুরি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আরও যোগ করেন, যদি কাশ্মীরের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়, তবে তা পারমাণবিক শক্তি দু’টির মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই, সন্ত্রাসী আর্থিক প্রবাহ বন্ধ করা এবং তথ্য শেয়ারিং বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি ২০২৬ সালে কোনো বড় আকারের সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। নিকটবর্তী দেশগুলো, বিশেষত চীন ও বাংলাদেশ, সম্ভাব্য শরণার্থী প্রবাহ ও বাণিজ্যিক ব্যাঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কূটনৈতিক দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের এই সতর্কতা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর (যেমন, জাতিসংঘ ও দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা) মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তারা সম্ভাব্য সংঘর্ষের পূর্বে শান্তি রক্ষার জন্য বিশেষ মিশন গঠন এবং দ্বিপাক্ষিক সংলাপকে ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইতিপূর্বে, ২০২১-২২ সালে দুই দেশের মধ্যে সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটলেও, তা দ্রুত সমাধান হয়ে যায়। তবে CFR-এর রিপোর্টে উল্লেখিত ২০২৬ সালের সম্ভাব্য সংঘর্ষের পরিধি ও তীব্রতা পূর্বের ঘটনার তুলনায় বেশি হতে পারে, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি বিবেচনা করলে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ মাইলস্টোন হিসেবে ২০২৪-২৫ সালে অনুষ্ঠিত দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক মিটিং এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামের ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখছেন। এই মিটিংগুলো যদি সাফল্যজনক হয়, তবে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি কমতে পারে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই সতর্কতা একটি আহ্বান যে, কাশ্মীরের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়া, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের দমন এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা গ্যারান্টি গড়ে তোলা অপরিহার্য। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে ২০২৬ সালে পুনরায় সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পারে।



