সৌদি আরব রিয়াদের সরকার গত মঙ্গলবার ইয়েমেনের দক্ষিণ উপকূলীয় বন্দর মুকাল্লায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুইটি জাহাজে সীমিত আকারের আকাশী হামলা চালানোর পর, দু’দিনের মধ্যে ইউএইকে ইয়েমেন থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করতে ২৪ ঘণ্টার শেষ সময় জানায়। এই পদক্ষেপের পেছনে আমিরাতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC)‑কে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি বিমান বাহিনী মুকাল্লা বন্দরকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, যেখানে দু’টি ইউএই জাহাজে সামান্য ক্ষতি হয়। কোনো মানবিক ক্ষতি বা প্রাণহানি রেকর্ড করা যায়নি, তবে জাহাজের কাঠামোতে ক্ষুদ্র ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। আক্রমণের পরপরই রিয়াদের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল‑মালিকি স্পষ্ট করে বলেন, গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে যে উভয় জাহাজে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করা হয় এবং সেগুলি ফুজাইরা বিমানবন্দর থেকে মুকাল্লায় পাঠানো হয়। তিনি যুক্তি দেন যে এই সরবরাহের মাধ্যমে আমিরাত STC‑কে সমর্থন দিচ্ছে, যা ইয়েমেনের ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতাকে হুমকি দেয়।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA)‑এর মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে তুর্কি আল‑মালিকি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা ইয়েমেনের ভূ-সীমা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই আমরা ইউএইকে অনুরোধ করছি, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন থেকে সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে নিক।” এই চূড়ান্ত সময়সীমা উভয় পক্ষের মধ্যে ইতিমধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রাশেদ আল‑আলিমিও মুকাল্লায় সৌদি আক্রমণের পর আমিরাতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, “আমিরাতের গোপন সমর্থন STC‑কে উসকানি দিচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতকে তীব্রতর করছে।” আল‑আলিমিও যুক্তি দেন যে, আমিরাতের এই পদক্ষেপগুলি ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের বিরোধী এবং তাই চুক্তি বাতিল করা অপরিহার্য।
পটভূমিতে দেখা যায়, ২০১৪ সালে হুথি গোষ্ঠী সানা দখল করার পর, তখনকার প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল‑হাদি সৌদিতে আশ্রয় নেন। হুথি বিদ্রোহ দমন এবং আল‑হাদিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সৌদি আরব, আমিরাত এবং ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করে। ২০১৫ সাল থেকে এই জোট হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে, যদিও এখন পর্যন্ত হুথি শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করা সম্ভব হয়নি।
২০১৯ সালে আমিরাত নিজস্ব সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে জোটের মধ্যে তার ভূমিকা হ্রাস করে, তবে সমর্থন ও সরবরাহের দিক থেকে তার অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যায়, আমিরাতের জাহাজে অস্ত্র বহন এবং STC‑কে সমর্থন করার অভিযোগের ফলে রিয়াদের চূড়ান্ত সতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি আমিরাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার না করে, তবে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপ বাড়তে পারে এবং ইয়েমেনের সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে, আমিরাতের সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের ফলে জোটের অভ্যন্তরে সমন্বয় ও কৌশলগত দিকনির্দেশে পরিবর্তন আসতে পারে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও এই ঘটনাটি নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। STC এবং হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধের পাশাপাশি, আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে দেশীয় নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। রাশেদ আল‑আলিমিওর চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বর্তমানে এই উত্তেজনার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন। সৌদি আরবের চূড়ান্ত সময়সীমা এবং আমিরাতের প্রত্যুত্তর উভয়ই ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধানে নতুন মোড় আনতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংলাপের অভাব এবং সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সৌদি আরবের এই চূড়ান্ত সতর্কতা এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে জোটের কাঠামো, সামরিক কৌশল এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। উভয় পক্ষের পদক্ষেপের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, ইয়েমেনের সংঘাতের পরবর্তী ধাপ কীভাবে গড়ে উঠবে।



