১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বুলগেরিয়া তার নিজস্ব লেভ মুদ্রা বন্ধ করে ইউরোকে সরকারি মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করবে। এভাবে দেশটি ইউরোঝোনে ২১তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। বুলগেরিয়া ১ জানুয়ারি ২০০৭ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এবং মার্চ ২০২৪-এ শেঞ্জেন অঞ্চলে প্রবেশের মাধ্যমে ইউরোপীয় সংহতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এখনো ছয়টি দেশ তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে চলেছে; সেগুলো হল চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং সুইডেন। ডেনমার্ক ১৯৯২ সালের এডিনবরা চুক্তির মাধ্যমে ইউরোঝোন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ নেওয়া হয়েছে, ফলে তার ওপর ইউরো গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা হিসেবে ৩৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ব্যবহার করে এবং মার্কিন ডলারের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বাধিক লেনদেন ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃত। ইউরোকে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) এবং ইউরোসিস্টেম পরিচালনা করে। নোটের ক্ষেত্রে ছয়টি মূল ডিজাইন রয়েছে, যেখানে ৫০০ ইউরো নোট ২০১৯ সালে মুদ্রণ বন্ধ হলেও এখনও বৈধ টেন্ডার হিসেবে গৃহীত। কয়েনের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ নিজস্ব জাতীয় চিত্র যুক্ত করে, তবে সব দেশে একই রকম মুখ্য নকশা দেখা যায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা ১৯৯৩ সালে হয়, যার মূল লক্ষ্য হল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য এবং সমন্বিত নীতি গড়ে তোলা। অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মানদণ্ড পূরণ করার পর ইউরো গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে; এই মানদণ্ড পূরণকারী দেশগুলোকে ইউরোঝোন বলা হয়। ইউরো গ্রহণের আগে দেশগুলোকে কমপক্ষে দুই বছর ইআরএম II (এক্সচেঞ্জ রেট মেকানিজম) তে থাকতে হয়, যেখানে জাতীয় মুদ্রা ইউরোর সাথে স্থির হারে যুক্ত থাকে। এই সময়ে মুদ্রার অস্থিরতা বেশি হলে ইউরো গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বুলগেরিয়ার ইউরোতে রূপান্তর স্থানীয় আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ হবে, ফলে রপ্তানি ও আমদানি খরচ কমে যাবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক পরিবেশ স্থিতিশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোঝোনে যোগদানের ফলে বুলগেরিয়ার ব্যাংকিং সেক্টরে ইউরো-ভিত্তিক ঋণ ও সঞ্চয় পণ্যের পরিসর বৃদ্ধি পাবে, যা ভোক্তা ও ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
ইউরো গ্রহণের ফলে বুলগেরিয়ার মুদ্রা রিজার্ভে ইউরোর অংশ বাড়বে, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে দেশের ক্রেডিট রেটিংকে সমর্থন করতে পারে। তবে ইআরএম II পর্যায়ে মুদ্রার অস্থিরতা বা ইউরো অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যেমন মুদ্রাস্ফীতি চাপ, দেশকে অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই বুলগেরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে।
ইউরোঝোনে ইতিমধ্যে যুক্ত চারটি ছোট দেশ—অ্যান্ডোরা, মোনাকো, সান মারিনো এবং ভ্যাটিকান সিটি—ও ইউরোকে তাদের সরকারি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে। এই দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, তবে ইউরোকে তাদের আর্থিক সিস্টেমের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। বুলগেরিয়ার ইউরোতে রূপান্তর এই তালিকায় নতুন একটি নাম যোগ করবে এবং ইউরোপীয় মুদ্রা বাজারের বিস্তৃতি আরও দৃঢ় করবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বুলগেরিয়ার ইউরো গ্রহণের ফলে ইউরোঝোনের মোট জিডিপি বৃদ্ধি পাবে এবং ইউরোপীয় আর্থিক সংস্থার জন্য নতুন গ্রাহক ভিত্তি তৈরি হবে। একই সঙ্গে ইউরোঝোনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্যও রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। তবে ইউরোঝোনের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা নীতি সমন্বয়, তহবিল প্রবাহ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সামঞ্জস্যের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, বুলগেরিয়ার ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইউরো গ্রহণের পরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুদ্রা একীকরণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি দেশীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তবে মুদ্রা অস্থিরতা এবং ইউরো অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য সতর্ক নীতি প্রয়োজন। ভবিষ্যতে ইউরোঝোনের সদস্য সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোর বৈশ্বিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে, এবং বুলগেরিয়া এই প্রবণতার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আর্থিক মঞ্চে তার অবস্থান সুদৃঢ় করবে।



