বিএনপির প্রাক্তন সভাপতি ও দুইবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পাঁচটি সাধারণ নির্বাচনে মোট তেইশটি আসন থেকে প্রতিবার জয়লাভ করে কোনো পরাজয় না পেয়ে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড গড়ে তুলেছেন। দশকব্যাপী তার নির্বাচনী সাফল্য, বিভিন্ন জেলা ও শহরে একাধিক ঘাঁটি থেকে একসাথে জয়লাভের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তি ও জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি ও জুন), ২০০১ এবং ২০০৮ সালের পাঁচটি নির্বাচনে তিনি মোট তেইশটি আসনে একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেছেন। বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে তার নামের তালিকায় থাকা ভোটারদের সমর্থন, তার রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তৃতি প্রকাশ করে।
২০২৪ সালের ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের জন্য তিনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায়ও তিনটি নির্বাচনী ঘাঁটি থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন। এই পদক্ষেপটি কেবল তার স্বাস্থ্যের উন্নতির আশায় নয়, বরং দলের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের অদম্যতা স্বীকার করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সঙ্গে সমান্তরাল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি ও শেখ হাসিনা, যিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বহু মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী, দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক শাখার নেতৃত্বে দাঁড়ান। দুজনের মধ্যে ক্ষমতার হস্তান্তর, নীতি-নির্ধারণ ও জাতীয় পরিচয়ের গঠনমূলক আলোচনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৯১ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি আসন থেকে একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে সম্পূর্ণ জয়লাভ করেন। এই বিজয় তার রাজনৈতিক শক্তি ও ভোটারদের আস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তী নির্বাচনে পুনরাবৃত্তি হয়।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিরোধী দল বয়কটের কারণে বিতর্কের মঞ্চে রূপ নেয়, তবু তিনি পাঁচটি ঘাঁটি থেকে জয়লাভ করেন। একই বছর জুনে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে, যদিও বিএনপি জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়, তবু তিনি পুনরায় পাঁচটি আসনে জয়লাভ করে তার অটল অবস্থান বজায় রাখেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার পাঁচটি ঘাঁটি থেকে জয়লাভ করেন, যা তার নির্বাচনী ধারাবাহিকতাকে আরও দৃঢ় করে। এই সময়ে তার রাজনৈতিক উপস্থিতি ও কৌশলগত নির্বাচন পরিকল্পনা, দলের সমগ্র জয়লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি সর্বোচ্চ পরাজয়ের মুখোমুখি হয়; কেবল ত্রিশটি আসনই জিতে। তবু খালেদা জিয়া তিনটি ঘাঁটি থেকে জয়লাভ করে দলের মধ্যে একমাত্র স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। তার এই জয়, দলের সংকটের মাঝেও তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বজায় রাখার ক্ষমতা তুলে ধরে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী রেকর্ড শেষ হয়। একটি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারান, ফলে ১৯৯১ সাল থেকে প্রথমবারের মতো বিএনপি তার নেতৃত্ব ছাড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও ভবিষ্যৎ কৌশলকে পুনর্বিবেচনার দরজা খুলে দেয়।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ, যাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খালেদা জিয়ার উত্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এই পরিবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে। তারা যুক্তি দেয় যে, দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য, এবং এটি গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
খালেদা জিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনী রেকর্ডের সমাপ্তি, বিএনপির জন্য নতুন নেতৃত্ব গঠনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। পার্টির অভ্যন্তরে নতুন মুখ উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা ও কৌশলগত পুনর্গঠন, আসন্ন নির্বাচনে পার্টির অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে দলটি কীভাবে তার ঐতিহাসিক শক্তি পুনরুদ্ধার করবে এবং ভোটারদের আস্থা পুনরায় অর্জন করবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলবে।



