খালেদা জিয়া, যিনি ২০০০ সালে বিরোধী দলের নেতা এবং পরে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন, ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভ্রান্তির পরিবর্তে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রাজনীতির প্রতি তার অটল বিশ্বাস প্রকাশ করেন। এই কথাগুলো মার্চ ২০০০-এ প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় এবং আজও দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।
সাক্ষাৎকারের সময় জিয়া স্পষ্টভাবে বলেন যে তিনি কোনো ধরনের বিভাজনমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখেন না; তার লক্ষ্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শক্তিশালীকরণ। তিনি যুক্তি দেন যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি শাসনব্যবস্থার মৌলিক নীতি ও জনগণের মঙ্গলের ওপর ভিত্তি না করে, তবে তা দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
১৯৯৯ সালের ৭ নভেম্বর, যখন তখন আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল, জিয়া এবং তার দল একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আয়োজন করেছিল। তবে ঐ সমাবেশে হঠাৎ বোমা ও টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর হিংসাত্মক হস্তক্ষেপের খবর পাওয়া যায়। জিয়া উল্লেখ করেন যে, সমাবেশের সময় তারা কোনো হিংসা বা অশান্তি সৃষ্টি করেনি, তবুও সরকারী শক্তি থেকে হঠাৎ আক্রমণ ঘটেছে।
সেই ঘটনার পর জিয়া এবং তার দলের সদস্যরা পুনরায় জানিয়েছেন যে, তাদের সমাবেশের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং গণতান্ত্রিক চাহিদা উপস্থাপন করা। তবে বোমা ও গ্যাসের আক্রমণ তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে নষ্ট করে দেয় এবং সমাবেশের সময় উপস্থিত জনগণের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে। জিয়া বলেন, এমন হিংসা সরকারী পরিকল্পনা না হলে ঘটতে পারত না।
প্রেসের স্বাধীনতা নিয়ে জিয়া স্পষ্টভাবে বলেন যে, তার দল কখনোই কোনো সংবাদপত্রের অফিসে হামলা করবে না এবং এ ধরনের কোনো কাজের অনুমোদনও দেয় না। তিনি দাবি করেন যে, সরকারী সত্তা যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন হয়ে দাঁড়ায়।
ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০০০-এ চার দল, সাত দল এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীসহ একটি বৃহৎ গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। জিয়া জানান, ঐ সমাবেশের সময়ও সরকারী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে হিংসা ব্যবহার করে demonstrators-কে আঘাত করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সমাবেশের স্বভাব শান্তিপূর্ণ হলেও সরকারী হস্তক্ষেপের ফলে তা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।
জিয়া বলেন, তাদের কর্মসূচি যতই শান্তিপূর্ণ ও আইনানুগ হোক না কেন, সরকারী হস্তক্ষেপের ফলে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন যে, সরকারী পরিকল্পনা না থাকলে এমন হিংসা ঘটত না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
সাক্ষাৎকারের শেষে জিয়া তার সমর্থকদের ঐক্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দলের নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে যদি অবিশ্বাস ও হতাশা থাকে, তবে তা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই তিনি সবাইকে একত্রে কাজ করতে এবং শান্তিপূর্ণ পথে পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আহ্বান জানান।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের মৃত্যুর পর, এই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশগুলো পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে। পুনঃপ্রকাশের মাধ্যমে জিয়ার ২০০০ সালের বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো—শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস এবং সরকারের হিংসাত্মক আচরণের সমালোচনা—আবার জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই পুনঃপ্রকাশের ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে জিয়ার পুরনো বক্তব্যগুলো নতুন আলোকে দেখা হবে। বিশেষ করে, সরকারী হিংসা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তার মন্তব্যগুলো আজকের রাজনৈতিক বিতর্কে পুনরায় প্রাসঙ্গিকতা পেতে পারে।
অবশেষে, জিয়া আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য। তিনি আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে সরকারী হস্তক্ষেপের বদলে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।



