১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া জয়লাভ করে, ফলে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তার শাসনকালের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন এবং বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমানো।
বহু বছর ধরে সরকারী নীতি ও জনমতকে প্রভাবিত করা ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে জিয়া দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়। এই জয় তাকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল এবং বিদেশি সহায়তার ওপর ভারী নির্ভরতা ছিল। পূর্ববর্তী সরকারের শেষ বছরে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে বহিরাগত আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ক্যালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) প্রবর্তন এবং রাজস্ব সংগ্রহের কাঠামো শক্তিশালী করা হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে দেশের মোট দেশীয় উৎপাদন (GDP) গড়ে বার্ষিক ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা পূর্ববর্তী ৩.৬ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তার অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থার ওপর নতুন নিয়মাবলী আরোপ করা হয়। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯৩ সালের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন এবং একই বছরের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন প্রণয়ন করে আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি করা হয়।
প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিষ্ঠা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। এই সংস্থাগুলো বাজারের তদারকি করে এবং বিদেশি ও দেশীয় উভয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তার সরকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য বৃত্তি ও বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হয়। একই সময়ে মহিলা মাধ্যমিক স্কুল সহায়তা প্রকল্প, মহিলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রকল্প, মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প এবং মহিলা মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি প্রকল্পের মতো চারটি প্রধান প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
১৯৯৩ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি শুরু হয়, যা ১৯৯৬ সালের মধ্যে ১,২৫৫টি ইউনিয়নে বিস্তৃত হয়। ২০০১ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সমর্থনে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় স্তরে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা হয়, যা শিক্ষার গুণগত মান ও উপস্থিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়ের অনুপাত ছিল ৫৫:৪৫, যা ১৯৯৬ সালে ৫২:৪৮ এ উন্নত হয়। একই সময়ে প্রাথমিক স্তরে তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটি বিশ লাখ থেকে বেড়ে এক কোটি ছিয়াত্তর লাখে পৌঁছায়, যার মধ্যে মেয়ের সংখ্যা প্রায় চুয়ান্ন লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় চুয়ান্ন লাখের কাছাকাছি হয়।
বিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষক জিয়ার নীতি সম্পর্কে সমালোচনা প্রকাশ করে। তারা উল্লেখ করে যে, দ্রুত আর্থিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণের ফলে কিছু সামাজিক গোষ্ঠীর উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নীতি বাস্তবায়নের পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা জিয়ার শাসনকালকে বাংলাদেশের আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তার অর্থনৈতিক ও শিক্ষামূলক সংস্কার ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জিয়ার উত্তরাধিকার কীভাবে গঠন করবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার নীতি ও সংস্কারগুলো পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে থাকবে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও শিক্ষার সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে।
সারসংক্ষেপে, খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন সংস্কার এবং শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়। তার শাসনকালের অর্জনগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর নেতৃত্বের গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে।



