রাজশাহী শহরের সাগরপাড়া মহল্লার এক প্রায় চল্লিশ বছর বয়সী নারী, প্রতিদিন সকাল আটটায় একটি বড় বস্তা নিয়ে ডাস্টবিনে গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করেন। তিনি একই দিনে বিকাল চারটায় বাড়ি ফিরে খাবার রান্না করে পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার ভাগ করেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি নিজের এবং পরিবারের মৌলিক খরচ মেটাচ্ছেন, যা শহরের দরিদ্র শ্রমিকদের জীবনের এক বাস্তব দৃষ্টান্ত।
নারীটি রাজশাহীর একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন, যেখানে মাসিক ভাড়া প্রায় তিন হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর বাকি টাকা দিয়ে তিনি ডাস্টবিন থেকে সংগ্রহ করা জিনিস বিক্রি করে গৃহস্থালির খরচ চালান। তার বাড়িতে বড় ছেলেটি সৌদি আরবে কাজের জন্য গিয়েছে, আর ছোট ছেলেটি স্থানীয় কোনো কারখানায় কর্মরত। দুজনের আয় মিলিয়ে পরিবারের আর্থিক চাহিদা পূরণ হয় না, তাই তিনি অতিরিক্ত আয়ের জন্য ডাস্টবিনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বড় ছেলেটির বয়স ছাব্বিশ, এবং বিদেশে কাজের মাধ্যমে তিনি পরিবারের জন্য কিছুটা আর্থিক স্বস্তি আনতে পারেন। তবে তিনি ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে এখনও সংগ্রাম করতে হয়। ছোট ছেলেটি স্থানীয় কারখানায় কাজ করলেও তার বেতন সীমিত, ফলে পরিবারের মোট আয় যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতি তাকে ডাস্টবিনে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়।
তার স্বামী, যিনি ফরিদপুরের ছিলেন, স্বর্ণকারের দোকানে কাজ করতেন এবং গড়ে এক হাজার টাকার আয় করতেন। তবে তিনি মদ্যপান ও নেশার কারণে আয় সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারতেন না, ফলে পারিবারিক আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর, প্রায় পনেরো বছর আগে, তিনি একা পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন।
প্রথমে শহরে নতুন এসে কাজ পেতে তিনি অসুবিধার মুখোমুখি হন; কেউ তাকে কাজ দিত না এবং আয়ও যথেষ্ট হতো না। এমন সময় পার্বতীপুরের এক সহকর্মী, নাম আনু, তাকে ডাস্টবিনে কাজ করার পরামর্শ দেন। আনু নিজে ডাস্টবিনে কাজ করতেন এবং বলেন, এই কাজের মাধ্যমে বাড়ির চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব। তার কথায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ডাস্টবিনে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এই কাজের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
ডাস্টবিনে কাজ করার সময় তিনি গরু ও কুকুরের সঙ্গে দেখা করেন, যেগুলোও খাবার খুঁজতে সেখানে আসে। যদিও তার দৃষ্টিতে গরু ও কুকুরের প্রতি কোনো বিশেষ মনোযোগ নেই, তবু তিনি তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তার কাজের সময়ে তিনি কখনোই গরু বা কুকুরের দিকে তাকিয়ে না, বরং নিজের কাজের উপর মনোযোগ দেন। এই দৃশ্যটি শহরের নগরী জীবনের এক অদ্ভুত দিককে প্রকাশ করে।
সম্প্রতি তিনি রাজশাহী শহরে একটি জমি কিনেছেন, যা ভবিষ্যতে বাড়ি কেনা বা ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনার অংশ। জমি ক্রয় তার আর্থিক স্বাবলম্বন বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা যায়, যদিও তার বর্তমান আয় সীমিত। জমি কেনার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতে ভাড়া বাড়ি থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজের স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলতে আশাবাদী।
তার বাবা-দাদার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার নন্দগাছি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে তার মা মারা গেছেন এবং বাবা দ্বিতীয় বিয়ে পুনর্বিবাহিত হয়েছেন। তার তিনজন ভাই আলাদা আলাদা পরিবারে বসবাস করেন, ফলে পারিবারিক সমর্থন সীমিত। এই পারিবারিক কাঠামো তার স্বতন্ত্রভাবে জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়।
বড় ছেলেটি বিদেশে কাজ করার সময় তিনি প্রায়ই বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িতে থাকতে না পারার স্বপ্ন দেখেন। তিনি আশা করেন, একদিন ছেলেটি দেশে ফিরে এলে তারা আর ভাড়া বাড়িতে না থেকে নিজের বাড়িতে বসবাস করতে পারবে। এই স্বপ্ন তার বর্তমান কঠোর পরিশ্রমের মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
রাজশাহীর নগরী শ্রমিকদের মধ্যে ডাস্টবিনে কাজ করা নারীদের সংখ্যা বাড়ছে, এবং এই নারীটি তার জীবনের কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও স্বপ্ন ও বাস্তবতা মিলিয়ে চলছেন। তার গল্প শহরের দরিদ্র শ্রমিকদের সংগ্রাম, স্বাবলম্বন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত প্রদান করে। পাঠকরা এই ঘটনায় থেকে বুঝতে পারেন যে, নগরী দারিদ্র্যের মধ্যে স্বপ্নের পেছনে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা কীভাবে কাজের পদ্ধতি ও জীবনের লক্ষ্যকে প্রভাবিত করে।



