নান, একটি ফুঁফুঁতে ও হালকা ফ্ল্যাটব্রেড, দক্ষিণ এশিয়ার রন্ধনশৈলীর অন্যতম প্রধান উপাদান। পারস্যের প্রাচীন রুটির নাম থেকে উদ্ভূত, আজ এটি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ঘরে-ঘরে এবং রেস্টুরেন্টে সমানভাবে পাওয়া যায়। তাজা গরম নানকে মাখন ও রসুনের ছিটা দিয়ে পরিবেশন করা হলে তা স্বাদে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
নান ও বাটার চিকেনের সমন্বয় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা আরামদায়ক খাবারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। নানের নরম গঠন খাবারের সঙ্গে মিশে স্বাদকে সমৃদ্ধ করে, আর তার হালকা স্বাদ মশলাদার গ্রেভির তীব্রতাকে সামঞ্জস্য করে। এই সমন্বয়ই নানকে একাধিক খাবারের সঙ্গী করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাপী ভারতীয় খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানও আন্তর্জাতিক মেনুতে স্থান পেয়েছে। টেস্ট আটলাসের সর্বোত্তম রুটির তালিকায় বাটার গার্লিক নানকে শীর্ষে রাখা হয়েছে, যেখানে আলু নান—আলু ও মশলা ভরা নান—ও উল্লেখযোগ্য। এই দুই রূপই স্বাদে সমৃদ্ধ এবং সহজে গ্রহণযোগ্য।
আজকের রেস্টুরেন্টগুলোতে নানকে বিভিন্ন রূপে পরিবেশন করা হয়; তন্দুরে বেক করা, গরম তেলে ভেজা, অথবা মাখন ও হার্বস দিয়ে গার্নিশ করা। ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশনকারী স্থানে নানকে প্রায়ই প্রধান রুটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা তার বহুমুখিতা ও স্বাদকে তুলে ধরে।
নানের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ঐতিহাসিক রেকর্ড কম, তবে বেশিরভাগ খাবার ইতিহাসবিদের মতে এটি প্রাচীন পারস্যে উদ্ভূত। পারস্যের শব্দে “নান” মানে রুটি, এবং ঐ সময়ে ময়দা ও পানির মিশ্রণকে গরম পাথরে বেক করা হতো। এই পদ্ধতি নানের মৌলিক গঠন ও স্বাদকে গড়ে তুলেছিল।
১৩শ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে সুলতানরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে শাসন করছিলেন, তখন নানও সঙ্গে সঙ্গেই এলো। মুসলিম শাসকরা পারস্য ও মধ্য এশিয়ার রন্ধনপ্রথা নিয়ে আসেন, যার মধ্যে তন্দুর—মাটির তৈরি ক্লে ওভেন—ও অন্তর্ভুক্ত। তন্দুরে নান বেক করা দ্রুতই রাজকীয় দরবারের খাবারের অংশ হয়ে ওঠে।
ইন্দো-পারস্য কবি আমির খুসরাও, যিনি আলাউদ্দিন খলজি ও মুহাম্মদ বিন তুগলকের সময়ের দরবারের জীবনচিত্র লিখেছিলেন, তিনি নানের দুই প্রকারের উল্লেখ করেছেন। তার রচনায় নানের বৈচিত্র্য ও রুচিকরতা তুলে ধরা হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে নানের মর্যাদা নিশ্চিত করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানের রূপান্তর ঘটেছে; আলু, পনির, পেঁয়াজ, গার্লিক ইত্যাদি দিয়ে ভরাট বা টপিং যোগ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো নানকে শুধু রুটি নয়, বরং স্বাদে সমৃদ্ধ এক খাবার হিসেবে গড়ে তুলেছে, যা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
বাড়িতে নান বানাতে তন্দুরের বদলে আধুনিক ওভেন বা গ্রিল ব্যবহার করা যায়; ময়দা, ইস্ট, দই ও গরম পানি মিশিয়ে ডো তৈরি করে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম দেওয়ার পর গরম পৃষ্ঠে বেক করলে নরম ও হালকা ফোঁটা পাওয়া যায়। যারা রেস্টুরেন্টে না গিয়ে নিজে চেষ্টা করতে চান, তাদের জন্য এই পদ্ধতি সহজ ও স্বাদে সমৃদ্ধ।
নান রুটির দীর্ঘ ইতিহাস ও বৈচিত্র্য আজকের খাবার সংস্কৃতিতে এক অনন্য স্থান দখল করেছে। পারস্যের প্রাচীন রুটি থেকে শুরু করে ভারতীয় দরবারের রাণী, এবং এখন বিশ্বব্যাপী টেবিলে, নান আমাদের স্বাদের যাত্রা দেখায়। একবার বাড়িতে নিজে বানিয়ে দেখুন, হয়তো আপনার খাবারের তালিকায় নতুন একটি প্রিয় রুটি যুক্ত হবে।



