লন্ডনের পশ্চিমে বসবাসকারী গার্ডেনার ও শৌখিন ফটোগ্রাফার ব্যারি ওয়েব, স্লাইম মোল্ডের ক্ষুদ্র জীবের চমকপ্রদ ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাক্রো লেন্স ব্যবহার করে একক কোষীয় এই জীবের সূক্ষ্ম গঠনকে নিকটদর্শনে উপস্থাপন করেন।
২০১৯ সালে স্লাইম মোল্ডের জগতে প্রথম পদার্পণ করার আগে, ওয়েব এই জীবের অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় তিনি বাগানে বেশি সময় কাটিয়ে এই অদ্ভুত জীবকে অনুসন্ধান করার সুযোগ পান। গার্ডেনার হিসেবে তার পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং শৌখিন ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ মিলিয়ে তিনি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃতিকে রেকর্ড করতে শুরু করেন।
স্লাইম মোল্ডকে ফাঙ্গি, উদ্ভিদ বা প্রাণী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না; এটি অ্যামিবা-সদৃশ একক কোষীয় জীব, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে। এই জীবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ওয়েব ব্যাখ্যা করেন যে, এটি ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল এবং কিছু ফাঙ্গি থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
ম্যাক্রো লেন্সের সাহায্যে তিনি স্লাইম মোল্ডের ফলদায়ক দেহ, অর্থাৎ ফ্রুটিং বডি,কে কেন্দ্র করে ছবি তোলেন। এই অংশে রঙের তীব্রতা এবং নাটকীয়তা সর্বোচ্চ থাকে, যেখানে স্পোর মুক্তি পায়। ফলে ছবিগুলোতে জীবের জীববৈচিত্র্য এবং সৌন্দর্য উভয়ই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
স্লাইম মোল্ডের আকার এত ক্ষুদ্র যে একক শটেই পুরো দেহকে তীক্ষ্ণভাবে ধরা কঠিন। এজন্য ওয়েব ফোকাস ব্র্যাকেটিং নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যেখানে একাধিক শট—কখনও কখনও একশো পর্যন্ত—নেয়া হয়। প্রতিটি শটে ফোকাসের সামান্য পার্থক্য থাকে, যা পরবর্তীতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে একত্রিত করে চূড়ান্ত ছবি তৈরি করা হয়।
প্রাথমিক সময়ে এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি শটের ফোকাস ম্যানুয়ালি সামঞ্জস্য করতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ এবং শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর ছিল। আধুনিক ক্যামেরা সিস্টেম এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোকাস স্ট্যাকিং সম্পন্ন করে, ফলে শুটিং প্রক্রিয়া দ্রুত এবং নির্ভুল হয়েছে। ওয়েব এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে “চতুর প্রযুক্তি” বলে উল্লেখ করেন।
ওয়েবের কাজ আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় স্বীকৃতি পেয়েছে; তিনি ব্রিটিশ ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডের ম্যাক্রো বিভাগে পিপলস চয়েস পুরস্কার জিতেছেন। এই পুরস্কার তার সৃষ্টিশীলতা এবং বিজ্ঞানকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ছবিগুলোকে শিল্প জগতের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়েও প্রশংসা করা হয়।
ফ্রুটিং বডির রঙিন ও নাটকীয় দৃশ্যের পাশাপাশি, ওয়েব স্লাইম মোল্ডের পরিবেশগত গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এই জীবের উপস্থিতি মাটির গুণগত মান উন্নত করে এবং অন্যান্য অণুজীবের জন্য বাসস্থান তৈরি করে। ফলে ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখতে স্লাইম মোল্ডের ভূমিকা অপরিহার্য।
রয়্যাল হাইড্রোগ্রাফিক সোসাইটি (RHS) উল্লেখ করেছে যে, স্লাইম মোল্ডকে নগর পরিবহন নেটওয়ার্কের সিমুলেশন এবং ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানের মতো উচ্চতর প্রযুক্তিগত প্রয়োগে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অপ্রচলিত ব্যবহারগুলো জীবের স্বয়ংক্রিয় পথনির্দেশনা ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে, যা জটিল সিস্টেমের অপ্টিমাইজেশনে সহায়তা করে।
ফটোগ্রাফি ও বিজ্ঞানকে একত্রিত করে ওয়েবের কাজ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্লাইম মোল্ডের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে। তার ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হয় এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রামে ব্যবহার করা হয়। ফলে এই অদৃশ্য জীবের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্লাইম মোল্ডের সূক্ষ্ম জগতকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা ওয়েবের কাজের মূল লক্ষ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আরও বেশি মানুষ এই জীবের পরিবেশগত ভূমিকা ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা সম্পর্কে জানবে। আপনার কি কখনো প্রকৃতির অদ্ভুত কোনো জীবকে নিকটদর্শনে দেখার সুযোগ হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তবে এই ধরনের ফটোগ্রাফি আপনাকে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করতে পারে।



