ভারতের সুপ্রিম কোর্ট উন্নাও জেলার ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সিংহ সেনগারের জীবনশিক্ষা দণ্ডের স্থগিতাদেশকে স্থগিত করার আদেশ দিয়েছে। এই আদেশের ফলে উচ্চ আদালতে তার দণ্ডবাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে।
সেনগারকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পি.ও.সি.এস.ও. (POCSO) আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য অপরাধের জন্যও বিচারের মুখে ছিলেন, যার মধ্যে মৃতদেহের পিতার মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত মামলা অন্তর্ভুক্ত।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে ২০১৭ সালের জুন মাসে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে চাকরির সুযোগের নামে ডেকে নিয়ে তাকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়। এই অপরাধটি উন্নাও জেলার উননো শহরে সংঘটিত হয় এবং স্থানীয় আইন অনুযায়ী এটি পি.ও.সি.এস.ও. আইনের অধীনে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির যোগ্য।
বিকলাঙ্গ কিশোরীকে আইনের অধীনে নাম প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, তবে তার বর্ণনা অনুযায়ী তিনি সেনগারকে চাকরির জন্য আবেদন করেন এবং পরে তাকে আটক করে বহুদিন ধরে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। তার দাবি অনুসারে, অপরাধের সময় সেনগার এবং তার সহকর্মীরা তাকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন।
২০১৮ সালে কিশোরী আত্মদাহের চেষ্টা করে জাতীয় দৃষ্টিগোচরে আসেন, যখন তিনি পুলিশের অকার্যকারিতার অভিযোগে নিজেকে অগ্নিতে জ্বালিয়ে ফেলতে চেষ্টা করেন। এই ঘটনাটি মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অপরাধের প্রকৃতির ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সেই সময়ে সেনগার উন্নাও জেলার বিধায়ক এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ে শাসনরত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য ছিলেন। তার রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাবের কারণে মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রসর হতে পারে না বলে অভিযোগ তোলা হয়।
মামলার পরিণতি স্বরূপ, বিজেপি সেনগারকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে এবং তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়। তবে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
সেনগারের দোষী সাব্যস্তের আগে কিশোরী একটি সন্দেহজনক গাড়ি দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন, যেখানে তার দুই চাচী মারা যান এবং তার আইনজীবী গুরুতরভাবে আহত হন। এই দুর্ঘটনা মামলায় নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে, কারণ এটি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়।
কিশোরীর পরিবার সেনগার ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে কিশোরীর পিতার ওপর আক্রমণের অভিযোগও তুলে। পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে, তবে একই সঙ্গে পিতাকে অবৈধ অস্ত্রধারী হিসেবে অভিযুক্ত করে জেলখানায় পাঠায়।
পিতার জেলখানায় অবস্থার অবনতি দ্রুত বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সেনগারের ওপর আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা চায়।
মার্চ ২০২০-এ সেনগারকে ‘দায়িত্বশীল হত্যা’ (culpable homicide) সহ অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, যা তার পূর্বের দণ্ডকে আরও কঠোর করে। তবে দণ্ডের কিছু অংশ পরে উচ্চ আদালতে স্থগিত করা হয়।
ডেলহি হাই কোর্ট গত সপ্তাহে সেনগারের জীবনশিক্ষা দণ্ডকে স্থগিত করে তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেয়, যদিও তিনি অন্য একটি মামলায় (পিতার মৃত্যু সংক্রান্ত) জেলখানায় রয়ে গিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে উন্নাও জেলার কিশোরী ও তার পরিবারে বিশাল রাগ ও প্রতিবাদ দেখা দেয়।
কিশোরী ও তার মাতা উভয়ই উচ্চ আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সমর্থন জানায়। প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা দণ্ডের স্থগিতাদেশকে ‘অন্যায়’ বলে সমালোচনা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আজকের আদেশে হাই কোর্টের স্থগিতাদেশকে ‘স্থগিত’ করা হয়েছে, যার ফলে সেনগারের দণ্ড পুনরায় কার্যকর হবে। আদালত উল্লেখ করেছে যে পি.ও.সি.এস.ও. আইনের অধীনে ‘অত্যাচারিত’ (aggravated) অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি কঠোর হওয়া বাধ্যতামূলক।
পি.ও.সি.এস.ও. আইনে ‘অত্যাচারিত’ ধর্ষণ বলতে এমন পরিস্থিতি বোঝায় যেখানে শিকারী নাবালিক এবং অপরাধে অতিরিক্ত হিংসা, দীর্ঘ সময়ের নির্যাতন বা একাধিক অপরাধীর অংশগ্রহণ থাকে। এই ধারা অনুযায়ী সেনগারের অপরাধকে ‘অত্যাচারিত’ হিসেবে গণ্য করা হলে দণ্ডের কঠোরতা বাড়বে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর উন্নাও জেলার মামলাটি পুনরায় উচ্চ আদালতে শোনার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। আদালত আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুনানির তারিখ নির্ধারণের কথা জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যথাযথ নথিপত্র জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে কিশোরী ও তার পরিবার আবার আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে ন্যায়বিচার দাবি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কীভাবে আদালত ‘অত্যাচারিত’ ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করবে তা দেশের মানবাধিকার নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



