শুক্রবার থেকে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে তীব্র শীতের তরঙ্গ প্রবাহিত হওয়ায় শিশুরা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডায়েরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বানচারামপুর উপজেলায় পাঁচ মাসের রাধিকা দাসের পরিবারও এই প্রবাহের শিকার হয়ে গৃহে ঠাণ্ডা হওয়ার পরপরই তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিল। রোগের অবনতি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা শহরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে রেফার করা হয়।
রাধিকার বাবা কৃষ্ণ চন্দ্র দাস জানান, রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সন্ধ্যা আটটায় জরুরি বিভাগে পৌঁছেছিলেন এবং সেখানে শ্বাসকষ্টের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সময়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাত থেকে আটজন রোগী, মূলত ঢাকা বাহিরের, একই সমস্যায় ভুগছিলেন। শয্যা ঘাটতির কারণে কিছু রোগীকে অন্য কোনো হাসপাতালে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়, আর বাকি রোগীর অভিভাবকরা শয্যা পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছিলেন।
হাসপাতালের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত রোগীর কারণে অতিরিক্ত ভিড় দেখা দিয়েছে; কিছু রোগী মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়ার ফলে শয্যা, অক্সিজেন সরঞ্জাম এবং মৌলিক সেবার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি রোগীর পরিবার এবং চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ জরুরি সেবা সময়মতো প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কেরানিগঞ্জের ছয় মাসের মোঃ আকবরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। শীতের কারণে তার শ্বাসযন্ত্রে তীব্র সংক্রমণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তাকে শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়। আকবরের হৃদয় সংক্রান্ত পূর্বস্থ রোগের কারণে তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়, ফলে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর করে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বাবা সিরাজ মিয়া জানান, এক সপ্তাহ আগে ঠাণ্ডা হওয়ার পর থেকে রোগের অবনতি ঘটেছে এবং তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দরকার হয়।
রাধিকা ও আকবরের মতোই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু শিশু শীতের তরঙ্গের ফলে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস এবং ডায়েরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে নবজাতক ও ছয় মাসের নিচের শিশুরা শীতের তীব্রতা এবং দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনেই শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ (এ.আর.আই) এবং ডায়েরিয়া রোগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টায় শেষ ২৪ ঘণ্টায় শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৩২ থেকে বাড়ে ৯৬৩-এ, যা রাত ৮টায় শেষ ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ডায়েরিয়া রোগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১,৯৯৮ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২,৬৭৬ হয়েছে। এই সংখ্যা দেখায় যে শীতের তরঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসযন্ত্র এবং হজমতন্ত্রের রোগে রোগীর প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে।
ডিজিএইচএসের আরও একটি তথ্য প্রকাশ করে যে ১ নভেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত মোট ২৫,৬৫১ রোগী শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এই বৃহৎ সংখ্যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অতিরিক্ত সম্পদ ও কর্মী প্রয়োজনীয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশু হাসপাতাল ও জরুরি বিভাগে শয্যা, অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রোগীর সেবা মানকে প্রভাবিত করছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহে শিশুরা যথাযথভাবে গরম রাখা, অতিরিক্ত ভেজা পোশাক পরানো এড়ানো এবং ঘরে পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া, শ্বাসযন্ত্রের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করা উচিত। বিশেষ করে নবজাতক ও কম বয়সী শিশুরা যদি জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা ডায়েরিয়া লক্ষণ দেখায়, তবে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের জন্য শেষ পরামর্শ হল, শীতের সময় শিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিষ্কার পরিবেশে রাখুন, পাশাপাশি টিকাদান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করুন। যদি কোনো লক্ষণ বাড়তে থাকে বা নতুন উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুন, যাতে জটিলতা এড়ানো যায়।



