বিএনপি’র পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি পার হয়ে গেছে। এই শেষ তারিখের পরই জানা যাবে কতজন নেতা পার্টি নির্বাচনী তালিকা থেকে বাদ পড়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সাত বছর পর নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ জিততে চেয়েছিলেন দল, তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে না গিয়ে বহু নেতা পার্টি প্রার্থীর বিপরীতে নিজেদের নাম নিবন্ধন করেছেন।
দলীয় তালিকা থেকে বাদ পড়া বা পার্টি নির্দেশনা অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নেতাদের সংখ্যা ২০০‑এর বেশি, যা দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় ছড়িয়ে আছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শতাধিক আসনে এখনো পার্টি মনোনয়নের বাইরে থাকা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা ভোটের জন্য প্রস্তুত। এদের মধ্যে কয়েকজনের পূর্বে সংসদ সদস্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে, আবার অন্যরা জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটের উচ্চপদস্থ নেতা।
দলীয় সতর্কতা সত্ত্বেও, বেশিরভাগই শেষ দিনই, অর্থাৎ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে, তাদের নাম নিবন্ধন করেছেন। পার্টি প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি, সমর্থক‑অনুসারীদের বিরোধিতা, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরেও এই নেতারা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাচ্ছেন। মোট ২,৫৮২টি মনোনয়নপত্র ৩০০টি আসনের জন্য জমা হয়েছে, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ছয়টি আসনে পার্টি তালিকা থেকে বাদ পড়া বা পার্টি সিদ্ধান্তের বাইরে থাকা বিএনপি নেতারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন সাবেক সংসদ সদস্য রুমিনা ফারহানা। তিনি টকশোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন এবং এখন পার্টি তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর স্বতন্ত্রভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া‑২ (সরাইল‑আশুগঞ্জ‑বিজয়নগরের দুই ইউনিয়ন) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রুমিনা ফারহানা বলেন, “এ নির্বাচন জনগণের নির্বাচন, এই নির্বাচন রুমিনা ফারহানার নির্বাচন। জনগণ ভোটের মাধ্যমে সব কিছুর জবাব দেবে। আল্লাহর কী পরিকল্পনা, ধানের শীষের বিপক্ষে লড়াই করতে হচ্ছে!”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাশাপাশি বাগেরহাটের তিনটি আসনে সাবেক সংসদ সদস্য এম.এ.এইচ. সেলিম স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এলাকার মানুষের ভালাবাসার টানেই পার্টি মনোনয়ন না পেলেও আমি নির্বাচন করতে চাই। আমি বাকি জীবনটা মানুষের জন্য কিছু করে যেতেই স্বতন্ত্র পদে নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছি।”
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পূর্বে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “বিএনপি পার্টি সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, পার্টি ও তার জোটের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীকে বিরোধী ভোট দেওয়া হবে কিনা তা নির্ধারণ করা হবে।
এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি নির্বাচনী গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পার্টি তালিকায় না থাকা প্রার্থীরা ভোটারদের কাছ থেকে সরাসরি সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করবে, যা আসনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে পার্টি প্রার্থী পরিবর্তন বা বাদ পড়ার ফলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রভাব বেশি হতে পারে।
বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিরোধের পরিণতি এখনো স্পষ্ট নয়, তবে পার্টি নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়ার ফলে নির্বাচনী কৌশল পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। পার্টি ও জোটের মধ্যে সমঝোতা কীভাবে গড়ে উঠবে, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাধ্যমে কী পরিমাণ ভোট সংগ্রহ করতে পারবে, তা আগামী সপ্তাহে স্পষ্ট হবে।
এদিকে, ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পার্টি তালিকায় না থাকা প্রার্থীদের প্রোগ্রাম ও নীতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের ভোটের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া। নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কী পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সমষ্টিগত পছন্দের ওপর।



