গ্যেনিভা শহরে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তা বিভাগের অধীনস্থ জেরেমি লিউইন এবং জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ প্রধান টম ফ্লেচার ২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড) মানবিক প্রকল্পের জন্য প্রদান করার ঘোষণা দেন। একই সময়ে লিউইন ইউএনকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, ভবিষ্যতে সহায়তা না বাড়ালে সংস্থা ‘অভিযোজন না করলে মরণ’ অবস্থায় পড়বে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার তীব্র আর্থিক সংকটের মাঝখানে করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবিক তহবিলের পরিমাণে ধারাবাহিক হ্রাস দেখা গেছে, এবং যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো অন্যান্য বড় দাতা দেশও সমানভাবে অবদান কমাচ্ছে। এই আর্থিক সংকোচন ইউএনের সামগ্রিক ত্রাণ কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
ফ্লেচার নতুন তহবিলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই অর্থের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ২ বিলিয়ন ডলার ইউএসের ঐতিহ্যবাহী মানবিক সহায়তার তুলনায় অল্প অংশ। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অবদান প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) ছিল, যা বর্তমান প্রতিশ্রুতির চেয়ে দশগুণ বেশি।
নতুন তহবিলের ব্যবহার নির্দিষ্ট ১৭টি দেশের ওপর সীমাবদ্ধ, যার মধ্যে হাইতি, সিরিয়া এবং সুদান অন্তর্ভুক্ত। এই দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ হিসেবে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকট উল্লেখ করা হয়েছে।
অফগানিস্তান ও ইয়েমেনকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। লিউইন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী এই দুই দেশে ইউএনের তহবিল তালি বানকে পৌঁছে যাচ্ছে, যা ট্যালিবান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে পড়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তাই ট্যাক্সদাতার অর্থকে সেসব গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে তিনি কোনো সহনশীলতা দেখাবেন না।
এই সীমাবদ্ধতা সরাসরি অনুদানপ্রাপ্ত দেশগুলোর ত্রাণ কাজকে প্রভাবিত করছে। আফগানিস্তানে মা ও শিশুর ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে, আর সুদানে শরণার্থীদের জন্য খাবারের রেশন কমে গেছে। তদুপরি, বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যু হার, যা আগে হ্রাস পাচ্ছিল, এই বছর আবার বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
নতুন তহবিলের শর্তে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রকল্পগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। লিউইন বলেন, জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো সরাসরি জীবন রক্ষার সঙ্গে যুক্ত নয় এবং তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের মধ্যে পড়ে না।
লিউইন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং তিনি ইউএসএআইডি শাটডাউন ও হাজারো কর্মী বরখাস্তের পরিকল্পনা করার জন্য দায়ী ছিলেন বলে জানা যায়। এই পটভূমি তাকে ইউএনের উপর কঠোর শর্ত আরোপ করতে সক্ষম করেছে।
ইউএনকে ‘অভিযোজন না করলে মরণ’ বলে সতর্ক করে লিউইন যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের প্রবেশদ্বার বন্ধ রাখবেন, যদি সংস্থা পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিগি ব্যাংক’ কেবলমাত্র সেই সংস্থাগুলোর জন্য উন্মুক্ত, যারা নতুন শর্ত মেনে চলবে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, এই ধরনের শর্তযুক্ত তহবিল ইউএনের স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করতে পারে এবং মানবিক সহায়তার ন্যায়সঙ্গত বণ্টনকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ইউএনকে তহবিলের উৎস ও শর্তের ওপর বেশি স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
যদি ইউএন লিউইনের চাহিদা মেনে না চলে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে, যা ইতিমধ্যে সংকটে থাকা ত্রাণ প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলবে। অন্যদিকে, ইউএন যদি শর্ত মেনে চলে, তবে মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে জাতিসংঘের মানবিক তহবিলের গ্লোবাল রিভিউ মিটিং আগামী মাসে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সদস্য দেশগুলো নতুন তহবিলের শর্ত ও বণ্টন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ২ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি মানবিক ত্রাণে সাময়িক স্বস্তি দেবে, তবে শর্তযুক্ত তহবিলের ফলে ইউএনের কার্যক্রমে নতুন চ্যালেঞ্জ উদ্ভূত হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনই গুরুত্বপূর্ণ হল এই শর্তগুলোকে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ মানবিক প্রভাব নিশ্চিত করা।



