আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত প্রার্থীরা আদালতের কাছ থেকে স্থগিতাদেশ পেয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। এই প্রার্থীদের শেষ অনুমোদন নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকবে, যা তাদের ভোটের যোগ্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে যে, ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বর্তমান ঋণ অবস্থা এবং আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি পৃথকভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে। ব্যাংকের এই তথ্যের ভিত্তিতে কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবে যে, প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না।
সেন্ট্রাল ব্যাংক ইনফরমেশন (সিআইবি) সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে যে, যেসব প্রার্থী আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পেয়েছেন, তাদের ঋণকে ‘নিয়মিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। তবে সেই রেকর্ডে একটি বিশেষ নোট থাকবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে যে, ঋণটি আদালতের আদেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলাপি স্থগিতাদেশের আওতায় রয়েছে।
পূর্বে নির্বাচনের প্রাক্কালে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ঋণকে ‘ভালো’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ ছিল, তবে এখন সিআইবি রিপোর্টে আদালতের সুরক্ষা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে এবং পূর্বের অনমনীয়তা বন্ধ করা হয়েছে। এই পরিবর্তন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম‑৪ আসনের প্রার্থী, রাইজিং গ্রুপের কর্ণধার, এবং প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ঋণযুক্ত ব্যবসায়ী। তিনি আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে এখনো নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম।
কুমিল্লা‑৬ আসনের প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরীও একই ধরনের স্থগিতাদেশ পেয়েছেন, তবে তিনি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক লিজিং কোম্পানির এক কোটি পঁয়ষট্টি লাখ টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। তার ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের প্রমাণ আদালতের সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিএনপির আরও অন্তত এক ডজন প্রার্থী একই রকম আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে কিছু উচ্চপ্রোফাইল প্রার্থীও অন্তর্ভুক্ত, যারা ঋণখেলাপি তালিকায় থাকলেও আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে নির্বাচনী বাধা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
বিএনপি জোটের প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার নামও ঋণখেলাপি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চেম্বার আদালত তার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি করে, ফলে তিনি আর কোনো আইনি বাধা ছাড়াই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
ঋণ তথ্য গোপন না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করছে। এই অতিরিক্ত কাজের সময়সূচি ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে, যাতে প্রায় তিন হাজার প্রার্থীর ঋণ তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা যায়।
সিআইবি এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার প্রার্থীর ঋণ অবস্থা যাচাই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিটি প্রার্থীর ঋণকে ‘নিয়মিত’ বা ‘খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের স্থগিতাদেশের তথ্যও রেকর্ডে যুক্ত হবে।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় প্রভাব ফেলবে। যদি অধিকাংশ ঋণখেলাপি প্রার্থীকে অনুমোদন দেয়া হয়, তবে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হবে এবং ঋণ সমস্যার সমাধানে সরকারের নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। অন্যদিকে, যদি কমিশন কঠোরভাবে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বাদ দেয়, তবে নির্বাচনের প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং ঋণ পুনর্গঠন নীতির পুনঃমূল্যায়ন জরুরি হয়ে উঠবে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে যে, আদালতীয় সুরক্ষা এবং ব্যাংক ঋণ অবস্থা কীভাবে নির্বাচনী যোগ্যতার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং আর্থিক দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।



