বিএনপির তথ্য‑প্রযুক্তি সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এপোলো ও লেখক মারুফ মল্লিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে ৪১ জন নাগরিক সমালোচনা করেছেন। তারা দাবি করেছেন, এই আইনি পদক্ষেপ জুলাই ২০১৩‑১৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মৌলিক চেতনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নীতির বিপরীত। যৌথ বিবৃতি সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এপোলো এবং মারুফ মল্লিকের ওপর দায়ের করা অভিযোগটি প্রকাশ্য মন্তব্যের ভিত্তিতে, যা স্বতন্ত্র মত প্রকাশের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এপোলো ও মারুফের সমর্থকরা দাবি করেন, মামলাটি ভিত্তিহীন এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দূর করতে চাওয়া হয়েছে।
সেই একই দিনে, ৪১ জন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একত্রে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে জানান, এই ধরনের মামলা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আদর্শের সরাসরি বিরোধিতা করে। তারা উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থান সময়ের স্বৈরাচারী শাসনের শিকার হয়ে যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদেরই এখন এই আইনি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্রভাবে উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা ও আইনি চাপের ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান মামলাটি, একটি মিডিয়া সম্পাদক কর্তৃক দুইজনের ওপর দায়ের করা, সেই দমনমূলক সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইঙ্গিত দেয়। তারা বলেন, এই সবের পেছনে স্বৈরাচারী শাসনের অবশিষ্ট প্রভাব কাজ করছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে হামলা, ছায়ানটের ধ্বংস এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করে সমাজে ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুকে কিছু প্রশ্ন তোলার কারণে মামলার আবেদন করা, এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে তারা সতর্ক করেন। সকল ধরণের মতপ্রকাশের জন্য বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, এটাই তাদের মূল দাবি।
বিবৃতি স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিদের তালিকায় শিল্পী অরূপ রাহী, শিক্ষক আর রাজী, আ‑আল মামুন, জাহেদ উর রহমান, লেখক পাভেল পার্থ, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, ফাতেমা শুভ্রা, অধ্যাপক সৌভিক রেজা, কবি রাসেল রায়হান, সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক জব্বার আল নাঈম, প্রকাশক সাঈদ বারী, সাংবাদিক কামরুল আহসান, লেখক তুহিন খান, গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ, কবি মৃদুল মাহবুব, অ্যাক্টিভিস্ট শামীম আরা নীপা, লেখক জাহিদ জগৎ, প্রকাশক মাহবুবুর রাহমান, লেখক সাদ রহমান, সাংবাদিক উপল বড়ুয়া, কবি সোয়েব মাহমুদ, রহমান হেনরী, কথাসাহিত্যিক আশরাফ জুয়েল, অধ্যাপক আবুল ফজল, কবি চঞ্চল বাশার, গীতিকার মহসিন আহমেদ, দীপান্ত রায়হান, গবেষক রুদ্র আল মোত্তাকিম, কবি অর্বাক আদিত্য, প্রকাশক মাহবুবুর রহমান, গণমাধ্যমকর্মী সাইদুন নবী, গবেষক আরিফ রহমান, শিক্ষক মোহাম্মদ শাজাহান, অ্যাক্টিভিস্ট হুমায়ুন কবীর, লেখক আবুল কালাম আল আজাদ, লেখক সালাহ উদ্দিন শুভ্র, অধ্যাপক গোলাম সারওয়ার, চলচ্চিত্রকার ইমামুল বাকের এ্যাপোলো, কবি মিসবাহ জামিল এবং আলোকচিত্রী মোল্লাহ মোহাম্মদ সাঈদসহ বহু বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এপোলো ও মারুফ মল্লিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি তাদের নামের ক্ষতি করে এমন ভুল তথ্যের প্রতিক্রিয়া। তারা যুক্তি দেন, আইনি পদক্ষেপটি প্রকাশ্য মন্তব্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ক্ষতি রোধের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই যুক্তিকে স্বতন্ত্র মত প্রকাশের দমন হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, এই বিতর্কটি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা যোগ করতে পারে। যদি আদালত মামলাটি গ্রহণ করে, তবে স্বতন্ত্র মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর আইনি চাপ বাড়তে পারে, যা স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে, যদি মামলাটি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ আইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক দল, মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে চলমান উত্তেজনার একটি নতুন মাত্রা প্রকাশ করছে।



