মালয়েশিয়ার বিমান সংস্থা মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের এমএইচ-৩৭০ ফ্লাইট, যা ৮ মার্চ ২০১৪-এ ১২ জন ক্রু এবং ২২৭ জন যাত্রী নিয়ে উড়ে গিয়েছিল, তার সন্ধান ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ৫৫ দিনের জন্য পুনরায় চালু হয়েছে। এই পুনরায় অনুসন্ধানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্ববৃহৎ সামুদ্রিক অনুসন্ধান অভিযান হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন অনুসন্ধানটি পর্যায়ক্রমে সমুদ্রের নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে চালানো হবে এবং মোট ১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার (প্রায় ৫,৮০০ বর্গমাইল) এলাকা কভার করবে। এই কাজের জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ওশান ইনফিনিটি নিয়োগ করা হয়েছে, যা পূর্বে বছরের শুরুর দিকে কাজ শুরু করেছিল কিন্তু এপ্রিল মাসে খারাপ আবহাওয়ার কারণে থামাতে বাধ্য হয়েছিল।
ওশান ইনফিনিটি এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে একটি “নো ফাইন্ড, নো ফি” চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে; অর্থাৎ অনুসন্ধানের সময় কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া না গেলে কোম্পানিকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। তবে যদি ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, তবে ওশান ইনফিনিটি ৭০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পাবে। এই শর্তটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা সংস্থার নজরে বিশেষ দৃষ্টিকোণ নিয়ে এসেছে, কারণ এটি ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান মডেলকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০১৪ সালের ৮ মার্চ, এমএইচ-৩৭০ ফ্লাইটটি কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ের পথে উড়ে গিয়ে হঠাৎ রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিমানটির যাত্রীদের মধ্যে ৯০ শতাংশ চীনা নাগরিক ছিলেন; বাকি ১০ শতাংশে মালয়েশিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান, ভারতীয়, ফরাসি, আমেরিকান, ইরানীয়, ইউক্রেনীয়, কানাডিয়ান, নিউজিল্যান্ডীয়, নেদারল্যান্ডসীয়, রাশিয়ান এবং তাইওয়ানীয় নাগরিক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বিমানটি অদৃশ্য হওয়ার পর, অস্ট্রেলিয়া নেতৃত্বে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়, যেখানে মালয়েশিয়া ও চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ সহযোগিতা করে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের একটি দূরবর্তী অঞ্চলে ৪৬,৩৩০ বর্গমাইল (প্রায় ১২০,০০০ বর্গকিলোমিটার) এলাকা স্ক্যান করা হয়। এই অনুসন্ধান ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চললেও কোনো দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পুনরায় অনুসন্ধানকে বহু দেশ একসাথে কাজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, “এমএইচ-৩৭০ বিষয়টি কেবল মালয়েশিয়ার নয়, পুরো এশিয়ার নিরাপত্তা ও আস্থা বিষয়ক একটি চ্যালেঞ্জ।” একই সঙ্গে, চীনের একটি কূটনৈতিক বিশ্লেষক জোর দিয়ে বলেছেন, “চীনের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারের ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।”
এই পুনরায় অনুসন্ধানের আরেকটি বৈশ্বিক প্রভাব হল সামুদ্রিক রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় অনুসন্ধান প্রযুক্তির ব্যবহার, যা ভবিষ্যতে সমুদ্রের গভীরতা ও দূরত্বে ঘটতে পারে এমন অনুরূপ ঘটনার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওশান ইনফিনিটি কোম্পানির ব্যবহৃত অটোমেটেড সাবমার্সিবল ও ড্রোনগুলোকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মেলনে প্রশংসা করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট প্রদান করবে এবং ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। যদি ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, তবে তা আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা সংস্থার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে বিমান নকশা ও রুট পরিকল্পনায় নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
এই অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা থাকবে যে ফলাফলটি কেবল পরিবারগুলোর শোকের সমাপ্তি নয়, বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা উন্নয়নের একটি মাইলফলক হবে।



