রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনায় নিযুক্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও তিনজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ বাতিলের আদেশ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে গতকাল (২৮ ডিসেম্বর) জারি করা হয়। আজ (২৯ ডিসেম্বর) এই সিদ্ধান্ত মিডিয়ার নজরে আসে, যার পেছনে হাদি হত্যার মামলায় অভিযুক্ত ফয়সালের জামিন সংক্রান্ত বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমালোচনা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাতিলকৃত কর্মকর্তাদের মধ্যে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ জুলফিকার আলম শিমুল এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম ইব্রাহিম খলিল, মো. মন্টু আলম ও মোহাম্মদ আইয়ুব আলী অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিয়োগ বাতিলের কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শুধুমাত্র “জনস্বার্থ” উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
শেখ জুলফিকার আলম শিমুলের পদত্যাগের পেছনে হাদি হত্যার মামলায় ফয়সালের জামিন ও রাষ্ট্রপক্ষের ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার ধারণা রয়েছে। তিনি মিডিয়ার প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, “গণমাধ্যমে যেভাবে ঘটনাটি উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তবতা তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। একটি নির্দিষ্ট মামলাকে কেন্দ্র করেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, মামলার শুনানির দিন তিনি স্বল্প সময়ের জন্য আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন, তবে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মামলাটি চালিয়ে গেছেন।
শিমুল উল্লেখ করেন, “প্রতিদিন আদালতে ১৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত মামলার শুনানি হয়। এর মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য অনুপস্থিত থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।” তিনি এ বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, তার অনুপস্থিতি কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত নয় এবং পুরো দায়িত্ব এখনও তার ওপরই অবশিষ্ট।
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম ইব্রাহিম খলিলও নিজের পদত্যাগের পেছনে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, “ফয়সালের মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে যথানিয়মে নোট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দীর্ঘদিন আগের নোট বা রিসিভ কপি সংরক্ষণের কোনো বাধ্যবাধকতা বা পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।” তার মতে, নথিপত্রের সংরক্ষণে ঘাটতি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
অধিকন্তু, খলিলের মন্তব্যে দেখা যায় যে রাষ্ট্রপক্ষের নোটের যথাযথ রেকর্ড না থাকায় মামলার প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, নোটের সংরক্ষণে অভাবের ফলে আইনগত দায়িত্বের স্পষ্টতা হারিয়ে গেছে, যা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই পদত্যাগের পেছনে হাদি হত্যার মামলায় ফয়সালের জামিনের অনুমোদন নিয়ে উত্থাপিত বিতর্কের পাশাপাশি ফেসবুকে আইন উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও উঠে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে কিছু ব্যবহারকারী সরকারী আইন উপদেষ্টার কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মন্তব্য করেছেন, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তেজিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের উচ্চপদস্থ আইন কর্মকর্তার পদত্যাগ সরকারী মামলায় স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলতে পারে। বিশেষ করে যখন মামলাটি জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত, তখন এমন পদক্ষেপের প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।
অধিকন্তু, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে “জনস্বার্থ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে এই সিদ্ধান্তটি জনসাধারণের আস্থা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে স্পষ্ট কারণ না জানিয়ে এই শব্দটি ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে অস্পষ্টতা বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের প্রত্যেকের দায়িত্বের পরিধি ব্যাপক। তারা প্রতিদিন শতাধিক মামলার শুনানিতে অংশ নেন, যার মধ্যে উচ্চপ্রোফাইল এবং সংবেদনশীল মামলাও অন্তর্ভুক্ত। তাই তাদের পদত্যাগের ফলে চলমান মামলাগুলোর প্রক্রিয়ায় অস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারী আইন বিভাগের কাঠামো পুনর্গঠন ও নথিপত্র সংরক্ষণে নতুন নীতি প্রণয়ন করা হতে পারে, যাতে একই ধরনের জটিলতা পুনরাবৃত্তি না হয়।
রাজনৈতিক দিক থেকে, এই পদত্যাগের ফলে সরকারী পক্ষের আইনগত কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে, বিশেষ করে হাদি হত্যার মামলায় ফয়সালের জামিন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতা বাড়াতে নতুন নীতি ও প্রক্রিয়া গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের নিয়োগ বাতিলের পেছনে হাদি হত্যার মামলায় জটিলতা, নথিপত্র সংরক্ষণে ঘাটতি এবং রাজনৈতিক সমালোচনার মিশ্রণ রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে চলমান মামলাগুলোর প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়বে এবং ভবিষ্যতে আইনগত কাঠামোর সংস্কার প্রত্যাশিত।



