স্পেনের সীমান্তে পৌঁছানোর জন্য সমুদ্র পথে ঝুঁকি নেওয়া অভিবাসীদের মধ্যে ২০২৪ সালে ৩,০৯০ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, যা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। অধিকাংশ মৃত্যু আফ্রিকান দেশ থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে অতিক্রান্ত আটলান্টিক রুটে ঘটেছে। এই সংখ্যা স্প্যানিশ অভিবাসন অধিকার গোষ্ঠী ক্যামিন্যান্ডো ফ্রন্টেরাসের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত।
গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৪৩৭ শিশু এবং ১৯২ নারী অন্তর্ভুক্ত, যা তরুণ ও নারীর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। বয়স ও লিঙ্গের এই বৈশিষ্ট্যগুলো সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও মানবিক সহায়তার অভাবকে নির্দেশ করে। মৃতের তালিকায় বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নারীবহুল পরিবার থেকে এসেছে।
মৃত্যুর বেশিরভাগই আফ্রিকান উপকূল থেকে ক্যানারি দ্বীপে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী আটলান্টিক রুটে ঘটেছে। বিশেষ করে আলজেরিয়া থেকে প্রস্থানকারী নৌকার সংখ্যা সাম্প্রতিক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং ঐ রুটে সোমালিয়া, সুদান ও দক্ষিণ সুদান থেকে অভিবাসীদের প্রবাহ তীব্রতর হয়েছে। এই পরিবর্তন অঞ্চলীয় সংঘাত ও অর্থনৈতিক অবনতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গত বছর, ২০২৩-এ, একই সমুদ্রপথে কমপক্ষে ১০,৪৫৭ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যা ২০০৭ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। যদিও ২০২৪ সালের মৃত্যুর সংখ্যা পূর্ব বছরের তুলনায় কমে এসেছে, তবু মোট মৃত্যুর পরিমাণ এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৫,৯৩৫ জন অভিবাসী স্পেনে পৌঁছেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। এদের প্রায় অর্ধেকই পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে আটলান্টিক রুটে ক্যানারি দ্বীপে পৌঁছেছেন, বাকি অংশ অন্যান্য ইউরোপীয় গন্তব্যে পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি সাম্প্রতিক মাসে কঠোর হয়েছে, এবং স্পেনের সরকার মরক্কোর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়াতে চুক্তি নবায়ন করেছে। এই চুক্তি নৌকা ধরা, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কাজের সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে, তবে মানবিক সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “আফ্রিকায় চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটই মূল চালিকাশক্তি, আর ইউরোপের সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়লেও সমুদ্রপথে ঝুঁকি কমে না যতক্ষণ না মূল কারণগুলো সমাধান হয়।” এই মন্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে।
সোমালিয়া, সুদান ও দক্ষিণ সুদান থেকে অভিবাসীদের প্রবাহের বৃদ্ধি এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের তীব্রতা ও মানবিক সংকটের সরাসরি ফলাফল। বিশেষ করে সুদানের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও সোমালিয়ার বন্যা পরিস্থিতি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সমুদ্র পারাপার করতে বাধ্য করছে।
আসন্ন ইউরোপীয় ইউনিয়ন শীর্ষ সম্মেলনে স্পেনের প্রতিনিধিরা সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রোগ্রামকে শক্তিশালী করার দাবি করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের বহুপাক্ষিক উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুর হার কমাতে সক্ষম হবে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৪ সালে স্পেনে পৌঁছানোর পথে ৩,০৯০ জনের মৃত্যু একটি দুঃখজনক বাস্তবতা, যা আফ্রিকান দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ইউরোপের সীমান্ত নীতি এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতির সমন্বয় ফল। ভবিষ্যতে সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নতি না হলে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।



