যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জেনেভা শহরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১৭টি দেশের জন্য মোট ২০০ কোটি মার্কিন ডলার মানবিক তহবিল প্রদান করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ, কঙ্গো, হাইতি, সিরিয়া এবং ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশ অন্তর্ভুক্ত, আর আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড এই তালিকায় নেই। তহবিলটি একটি সমন্বিত ফান্ডের মাধ্যমে বিতরণ হবে, যেখানে বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা ও অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্ষেত্রগুলোকে অর্থ বরাদ্দ করা হবে।
এই নতুন পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, এই কাঠামোটি দাতা দেশের আর্থিক অবদানের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করতে সহায়ক হবে। তহবিলের পরিচালনা ও বিতরণে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর ও তার প্রধান টম ফ্লেচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
তহবিলের প্রথম কিস্তি চলতি বছরের জন্য ওসিএইচএ (OCHA) এর বার্ষিক সহায়তা আহ্বানের ভিত্তিতে প্রদান করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ-সমর্থিত মানবিক প্রকল্পে বার্ষিক অবদান সর্বোচ্চ ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে স্বেচ্ছা অনুদান ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি অংশ নিয়মিত চাঁদা হিসেবে প্রদান করা হয়।
এই উদ্যোগের প্রতি মানবিক সহায়তা কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগের স্রোত রয়েছে। তারা সতর্ক করেছেন, তহবিলের নতুন বণ্টন পদ্ধতি কিছু প্রোগ্রাম ও সেবায় উল্লেখযোগ্য কাটছাঁটের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পগুলোতে তহবিলের পুনঃবণ্টন প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
গাজা অঞ্চলের জন্য আলাদা তহবিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হবে। যদিও ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড মূল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন গাজা সহায়তার জন্য পৃথক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
সমালোচকরা যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে অপ্রতুল বলে সমালোচনা করছেন। তারা উল্লেখ করেন, এই ধরণের তহবিল হ্রাসের ফলে বিশ্বব্যাপী অনাহার, স্থানচ্যুতি এবং রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে, এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাবও ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা জেনেভায় প্রকাশিত বক্তব্যে জোর দিয়ে বলছেন, মানবিক সহায়তা বিতরণে আরও সমন্বিত নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। তারা উল্লেখ করেছেন, এই তহবিলের মাধ্যমে কম করদাতার অর্থে বেশি কার্যকর সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘের মধ্যে প্রভাব বাড়ানোর কৌশল হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা প্রোগ্রামগুলো প্রায়ই স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হতো, তবে এখন সমন্বিত ফান্ডের মাধ্যমে একাধিক সংস্থা ও দেশকে একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী, তহবিলের ব্যবহার ও ফলাফল নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, এবং পরবর্তী বছরের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তহবিলের কার্যকারিতা ও প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ কোটি ডলারের মানবিক তহবিলের ঘোষণা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার কাঠামোতে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে, তবে তহবিলের বণ্টন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তহবিলের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর।



